বাবুগঞ্জের ৩ জুলাই শহীদ পরিবারের ক্ষত এখনো তাজা
- ০৬:২২:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / 82
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ২ ছাত্র এবং ১ জন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মী শহীদ হয়েছেন। ঘটনার প্রায় দুই বছর হতে চললেও তিন শহীদ পরিবারের কান্না আজও থামেনি।
ফয়সাল আহমেদ শান্ত। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের ছেলে। তার মা স্কুলশিক্ষিকা কোহিনূর বেগম। জাকির হোসেন জাহাজের পুরনো আসবাবপত্রের ব্যবসা করেন। ছোটবোন বৃষ্টি ও মা কহিনূরকে নিয়ে চট্টগ্রামের ইপিজেডে ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা।
চব্বিশের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর ২নং গেটের মাঝামাঝি জায়গায় কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে আন্দোলনরত অবস্থায় গুলিতে নিহত হন শান্ত। ওমর গণি (এমইএস) কলেজের বিবিএ প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। চব্বিশের ১৭ জুলাই বাবুগঞ্জের মহিষাদী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। তার শরীরে তিনটি গুলি লেগেছিল।
সন্তান হারানোর ২০ মাস পরও মা কহিনূর কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছেন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক বাবা জাকির হোসেনও। ভাইয়ের অকাল প্রাণহানি মানতে পারছে না ছোটবোন সুমাইয়া জান্নাত বৃষ্টি।
শান্তর বাবা জাকির হোসেন বলেন, বিনাদোষে আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই আমি। আমি জাকির হোসেন শহীদ শান্তর গর্বিত বাবা; এটাই আমার পরিচয়।
শান্তর মা বলেন, আমার তো অনেক আশা ছিল। আমার ছেলে পড়ালেখা করে পুরস্কার নিয়ে আসবে। আমার বাবা যে এতো বড় অ্যাওয়ার্ড নিয়ে আসবে, আমি তো বুঝতে পারি নাই। আমাকে সে সেরা মায়ের সম্মান দিয়ে গেল। আমি শহীদের সম্মানিত মা, এখন এই পরিচয় আমার জন্য অনেক গর্বের।
অন্যদিকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপোর্ট স্টাফ ছিলেন আবদুল্লাহ আল আবির (২৭)। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেমে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দিনভর সংঘর্ষ চলে। সন্ধ্যায় গুলিতে পেটের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার। ২১ জুলাই রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ওইদিন রাতে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
বাবুগঞ্জের ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের মিজানুর রহমান বাচ্চুর ছেলে আবদুল্লাহ বোনের সঙ্গে ঢাকার ভাড়া বাসায় থাকতেন। ভগ্নিপতি মহিমুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার সুবাদে আবদুল্লাহরও সেখানে চাকরির ব্যবস্থা হয়। তার বাবা বাচ্চু বরিশাল নগরের জননিরাপত্তা অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামে এখনো আবদুল্লাহকে হারানোর শোকের ছায়া বিরাজ করছে। একমাত্র ভাইয়ের মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছেন না বোন মারিয়া আক্তার। মারিয়া বলেন, গুলিতে তার কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসক একটি কিডনি কেটে ফেলেন। তারপরও ভেতরের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। ১১ ব্যাগ রক্ত দিলেও শরীরে ধরে রাখা যায়নি।
আবদুল্লাহর মা পারভীন সুলতানা ছেলের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। তার বিজয় হয়েছে। কিন্তু আমার আবির দেখে যেতে পারল না।
অন্যদিকে চব্বিশের ৫ আগস্ট আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়ের কয়েক ঘণ্টা আগে নিহত হন রাকিব হোসাইন (২৮)। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মানিককাঠি গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেনের ছেলে তিনি।
রাকিব বরিশাল থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ডিপ্লোমা করে বিএসসির জন্য ভর্তি হন ঢাকার সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে। জানা যায়, শুরু থেকে রাকিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
রাকিবের বড় ভাই আবুল কালাম বলেন, আমার ভাইকে দুইটা গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ। দুইটা গুলিই তার পেটে বিদ্ধ হয়। তবে তলপেটের গুলিটি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
রাকিব হোসাইনের প্রতিবেশীরা জানান, একজন প্রতিবাদী যুবক হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত ছিলেন রাকিব। অন্যায় দেখলে মুখ বুজে থাকতেন না তিনি। দুই ভাই, তিন বোনসহ সাতজনের সংসার তাদের। তার কৃষক বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। রাকিবকে ঘিরেই সব স্বপ্ন ছিল তাদের। তাই রাকিবের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ পুনর্বাসন করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমাউল হুসনা বলেন, তথ্য মোতাবেক জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে বাবুগঞ্জ উপজেলায় ৩ যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। ইতোমধ্যে আমরা নিহতদের পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছি।




















