১৮ টাকায় কেনা বায়োস্কোপে ৫০ বছর কেটে গেল আগৈলঝাড়ার প্রবীণ শিল্পী সর্বানন্দের
- ০১:৪৩:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 25
দূর থেকে ভেসে আসে ডুগডুগির শব্দ। সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে এক পরিচিত ডাক—“আসেন আসেন, কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ দেখেন; দেশের-বিদেশের ছবি দেখেন।” এমন ডাক শুনে কৌতূহলী শিশুদের পাশাপাশি ভিড় করেন বয়স্করাও। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ‘বায়োস্কোপ’ আজও কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রবীণ শিল্পী সর্বানন্দ মধু।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বয়স ৮১ বছর। উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু টানা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রাম ও মেলায় বায়োস্কোপ প্রদর্শন করে আসছেন। এই লোকজ শিল্পই শুধু নয়, বায়োস্কোপই তাঁর পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
সর্বানন্দ মধুর জীবনের গল্পও অনেক সংগ্রামের। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি মেজ। বাবা ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি। অভাবের সংসারে লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি। এমনও সময় গেছে, যখন নিজের পড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খেতে হয়েছে তাঁকে। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়।
প্রায় ৫০ বছর আগে যশোরের বেনাপোলে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাত্র ১৮ টাকায় একটি পুরোনো বায়োস্কোপ কিনে নেন তিনি। ভালোবেসে এর নাম দেন ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। এক হাতে ডুগডুগি, অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দময় ভাষায় মানুষকে ডাকতেন। তাঁর সেই অভিনব উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে শিশু-কিশোররা দল বেঁধে ছুটে আসত।
লাল রঙের কাঠের বায়োস্কোপ বাক্সটির সামনে রয়েছে কয়েকটি চোঙার মতো লেন্স। ভেতরে কাপড়ের সঙ্গে সাজানো থাকে ধারাবাহিক ছবি। পাশের হ্যান্ডেল ঘোরালে একের পর এক ছবি সামনে আসে। আর সেই ছবির সঙ্গে গল্প বলতে বলতে দর্শকদের নিয়ে যান এক ভিন্ন জগতে। একসময় সেখানে থাকত মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিশ্বের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান, পশুপাখি ও শিক্ষামূলক নানা ছবি।
শুরুর দিকে পাঁচ কিংবা ১০ পয়সা, কখনো এক মুঠো চালের বিনিময়ে বায়োস্কোপ দেখাতেন সর্বানন্দ। এখন প্রতিজনের কাছ থেকে ১০ টাকা নেন। বিভিন্ন মেলা ও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দিনে এক হাজার থেকে বারোশ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে আগের মতো দর্শক আর নেই। তবুও মানুষের ভালোবাসাই তাঁকে এখনো পথে রাখে।
সর্বানন্দ মধু বলেন, “জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। বই বিক্রি করে চাল কিনে খেয়েছি। তখন ভাবিনি এই বায়োস্কোপই একদিন আমার পরিচয় হবে। এই বায়োস্কোপ দেখিয়েই ভাই-বোনদের লেখাপড়া করিয়েছি, ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছি, কিছু জমিজমাও কিনেছি। এখন বয়স হয়েছে, শরীর আগের মতো চলে না। তবুও মানুষ ডাকলে চলে যাই। মানুষ আনন্দ পেলে আমারও ভালো লাগে।”
তবে তাঁর আক্ষেপও কম নয়। তিনি বলেন, “মোবাইল আর ইন্টারনেটের যুগে বায়োস্কোপের কদর অনেক কমে গেছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ এখনো ভালোবেসে দেখে। আমি চাই, এই ঐতিহ্য যেন আমার সঙ্গে হারিয়ে না যায়।”
আগৈলঝাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম হাওলাদার বলেন, “ছোটবেলায় সর্বানন্দ কাকার বায়োস্কোপ দেখে বড় হয়েছি। এখন নিজের সন্তানদেরও দেখাই। এটা শুধু বিনোদন নয়, আমাদের শৈশবের স্মৃতি।”
স্থানীয় কলেজশিক্ষক সুমন কুমার বিশ্বাস বলেন, “সর্বানন্দ মধু একজন জীবন্ত লোকসংস্কৃতি বহনকারী মানুষ। তাঁর মতো শিল্পীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন। না হলে একসময় এই শিল্প শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।”
বরিশাল চারুকলার সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুশান্ত ঘোষ বলেন, “দেশ দ্রুত বদলাচ্ছে, বিনোদনের ধরনও পাল্টে গেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মাঝেও কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স ঝুলিয়ে, ডুগডুগি বাজিয়ে পথ হাঁটেন সর্বানন্দ মধু। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য শুধু জাদুঘরে নয়, মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতিতেও বেঁচে থাকে।”
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরুপম মজুমদার বলেন, “লোকঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারিভাবে যা করার সুযোগ আছে, তা করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করা হবে।”
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, বায়োস্কোপ একসময় গ্রামীণ জনপদের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন ছিল। প্রযুক্তির বিস্তারে এই শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। এমন সময়ে সর্বানন্দ মধুর মতো মানুষ শুধু একজন বায়োস্কোপ প্রদর্শক নন, তাঁরা বাংলাদেশের লোকঐতিহ্যের জীবন্ত ধারক ও বাহক। তাঁদের হাত ধরেই এখনো টিকে আছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক অনন্য সংস্কৃতি।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ











