বরিশাল ১১:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
বরিশালে দিনের অর্ধেক সময়ই থাকছে না বিদ্যুৎ বরিশালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রশিবিরের সংবর্ধনা বরিশাল, ভোলা ও ঝালকাঠি জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী সোহেল মনজুর মাউশির বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক হলেন জাকির হোসেন মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত, সড়কপথে ভোলা থেকে যাওয়া যাবে বরিশাল-ঢাকা বরিশাল বিএম কলেজ: বিসিএস শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে অধ্যাপ‌ক আজাদের পদায়ন বাতিল বরগুনায় প্লাস্টিকের ব্যাগে জীবিত উদ্ধার নবজাতকের ঠাঁই হলো আগৈলঝাড়ার ছোটমণি নিবাসে আগৈলঝাড়ায় ৯ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ: আদালতে ৬০ বছরের আসামির আত্মসমর্পণ গৌরনদীতে বেদে পল্লীতে দু’পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলা, নারীসহ আহত ১৫ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বরিশাল-ঢাকা নৌ রুট: লোকসানে চোখে অন্ধকার দেখছেন লঞ্চ মালিকরা

Agailjhara Post
  • ১২:০৫:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / 10

একসময় সন্ধ্যা নামলেই কীর্তনখোলা নদীর তীরে শুরু হতো ব্যস্ততা। একের পর এক বিলাসবহুল লঞ্চের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত বরিশাল নদীবন্দর। যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত টার্মিনাল। ঢাকা-বরিশাল নৌপথ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর চার বছরেই বদলে গেছে সেই চিত্র। যাত্রী সংকটে একের পর এক লঞ্চ বসে থাকছে নদীতে। কেউ বিক্রি করে দিচ্ছেন, কেউ তুলে দিচ্ছেন ভাঙারির কাছে। আর যারা এখনো লঞ্চ চালু রেখেছেন, তারাও বলছেন লোকসানে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৪ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী প্যাডেল স্টিমার চলাচল শুরু হয়। পরে ১৯৬০-এর দশকে বেসরকারি মালিকরা এ পথে লঞ্চ নামান। কাঠের ছোট লঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয় বিশাল স্টিলবডির বিলাসবহুল লঞ্চ। একসময় ঢাকা-বরিশাল নৌপথে তিন-চারতলা লঞ্চ ছিল যাত্রীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। কেবিনের টিকিট পাওয়া ছিল অনেকটা সোনার হরিণের মতো।

কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি। সড়কপথে ঢাকা যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যাত্রীদের বড় একটি অংশ বাসমুখী হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে নিয়মিত লঞ্চের সংখ্যা কয়েকটিতে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের ঈদ মৌসুমেও আগের তুলনায় অনেক কম লঞ্চ নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করেছে।

কম সময়ে বাসে ঢাকা, তাই লঞ্চে যাত্রী সংকট

লঞ্চে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে সাধারণত ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। বিপরীতে পদ্মা সেতু হয়ে সড়কপথে এর তুলনায় অনেক কম সময়ে রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব। ফলে সময় বাঁচাতে অনেক যাত্রী এখন বাসকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

শুধু সময় নয়, লঞ্চের সেবার মান নিয়েও যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশসহ নানা কারণে অনেকেই আগের মতো লঞ্চে আগ্রহী নন। ফলে অনেক লঞ্চ ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রীও পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে যাত্রী সংকটের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

লঞ্চ মালিকদের হিসাবে, একটি বিলাসবহুল লঞ্চের বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল রাউন্ড ট্রিপে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। অথচ অধিকাংশ ট্রিপে লঞ্চপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এরপরও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে অনেক মালিক বাধ্য হয়ে লঞ্চ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিক্রি হয়ে গেল সুরভী-৭

নৌপথের চলমান সংকটের সাম্প্রতিক উদাহরণ বিলাসবহুল লঞ্চ এমভি সুরভী-৭। প্রায় দুই যুগ আগে নির্মিত এ লঞ্চটি চলতি বছরের জুনে বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় মালিকপক্ষ। প্রথমে ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা দাম চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, লঞ্চটি পরিচালনার জন্য বিক্রি করা হলেও পরে নতুন মালিক ঢাকার একটি শিপইয়ার্ডে নিয়ে সেটি ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করেন। যাত্রী সংকট ও দীর্ঘদিনের লোকসানই এর পেছনে অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পদ্মা সেতু চালুর পর গত চার বছরে সুরভী-৭সহ ডজনখানেক বিলাসবহুল লঞ্চ বিক্রি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কোনো কোনো লঞ্চ আবার শিপইয়ার্ড বা ডকইয়ার্ডে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর ফলে শুধু লঞ্চ ব্যবসাই সংকটে পড়েনি, কর্মহীন হয়েছেন নৌযানশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ।

ভাড়া কমিয়েও ফিরছে না যাত্রী

যাত্রী ধরে রাখতে বিভিন্ন সময় লঞ্চ মালিকরা ভাড়াও কমিয়েছেন। তিনতলা লঞ্চে ডেকের ভাড়া ৩৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। চারতলা লঞ্চেও কমানো হয়েছে ভাড়া। ভিআইপি, বিজনেস ক্লাস, কেবিন ও সোফার ভাড়াতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে সরকার নির্ধারিত ডেক ভাড়া ৪০৭ টাকা। তবে যাত্রী সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ে অনেক লঞ্চে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, এমনকি এর চেয়েও কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে ঈদের সময় যাত্রী বাড়লে ভাড়া সরকার নির্ধারিত হারের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের লোকসানও অনেক সময় ঈদ মৌসুমের আয়ে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন মালিকরা।

রোটেশন পদ্ধতিতে চলছে লঞ্চ

সব লঞ্চ একসঙ্গে চালালে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ে। তাই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মালিকরা রোটেশন পদ্ধতিতে কিছু লঞ্চ চালু রেখে বাকিগুলো বসিয়ে রাখছেন। এতে একটি লঞ্চকে নিয়মিত ট্রিপ দেওয়ার বদলে কয়েক দিন পরপর চলতে হচ্ছে।

আগেও এ রুটে প্রতিদিন একাধিক লঞ্চ চলাচল করলেও পদ্মা সেতু চালুর পর সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌপথে যাত্রী কমার বিষয়টি একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংকটে জাহাজ নির্মাণ শিল্পও

নৌপথে লঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও। কীর্তনখোলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা বড় শিপইয়ার্ডসহ অনেক ডকইয়ার্ডে আগের মতো কাজ নেই। নতুন লঞ্চ নির্মাণ কমে যাওয়ায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নতুন লঞ্চ নির্মাণে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পুরোনো লঞ্চ বিক্রি কিংবা স্ক্র্যাপ হিসেবে ভেঙে ফেলার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর দাবি

লঞ্চযাত্রী শাহ নেওয়াজ বলেন, লঞ্চের সেবা আগের মতো নেই। অনেক লঞ্চ অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পরিচালনা করা হচ্ছে। খাবারের মানও আগের মতো ভালো নয়। এসব কারণে যাত্রীদের মধ্যে লঞ্চ ভ্রমণের আগ্রহ কমেছে।

সুরভী শিপিং লাইনস ও শিপইয়ার্ডের পরিচালক রেজিন উল কবির বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় যাত্রী অনেক কম হওয়ায় লঞ্চ মালিকরা লোকসানে রয়েছেন। যাত্রীসেবার মান বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেকারত্ব ঠেকাতে লঞ্চ চালু রাখতে হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে লঞ্চের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।

এমভি অ্যাডভেঞ্চার লঞ্চের কেবিন ইনচার্জ জাহিদ বলেন, প্রতি ট্রিপে অনেক সময় পরিচালন ব্যয়ও উঠে আসে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে লঞ্চশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নদীবন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে পন্টুনসহ নদীতে নিরাপদ যাত্রী চলাচলের জন্য কাজ করছে বিআইডব্লিউটিএ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি কম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে এর ফলে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী নৌপথ ও লঞ্চশিল্প যে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, সময় কমানো, ভাড়া কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং নৌপথকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় বরিশাল-ঢাকা নৌপথে বিলাসবহুল লঞ্চের সেই পুরোনো ব্যস্ততা শুধুই স্মৃতি হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: যুগান্তর

নিউজটি শেয়ার করুন

বরিশাল-ঢাকা নৌ রুট: লোকসানে চোখে অন্ধকার দেখছেন লঞ্চ মালিকরা

১২:০৫:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

একসময় সন্ধ্যা নামলেই কীর্তনখোলা নদীর তীরে শুরু হতো ব্যস্ততা। একের পর এক বিলাসবহুল লঞ্চের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত বরিশাল নদীবন্দর। যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত টার্মিনাল। ঢাকা-বরিশাল নৌপথ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর চার বছরেই বদলে গেছে সেই চিত্র। যাত্রী সংকটে একের পর এক লঞ্চ বসে থাকছে নদীতে। কেউ বিক্রি করে দিচ্ছেন, কেউ তুলে দিচ্ছেন ভাঙারির কাছে। আর যারা এখনো লঞ্চ চালু রেখেছেন, তারাও বলছেন লোকসানে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৪ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী প্যাডেল স্টিমার চলাচল শুরু হয়। পরে ১৯৬০-এর দশকে বেসরকারি মালিকরা এ পথে লঞ্চ নামান। কাঠের ছোট লঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয় বিশাল স্টিলবডির বিলাসবহুল লঞ্চ। একসময় ঢাকা-বরিশাল নৌপথে তিন-চারতলা লঞ্চ ছিল যাত্রীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। কেবিনের টিকিট পাওয়া ছিল অনেকটা সোনার হরিণের মতো।

কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি। সড়কপথে ঢাকা যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যাত্রীদের বড় একটি অংশ বাসমুখী হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে নিয়মিত লঞ্চের সংখ্যা কয়েকটিতে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের ঈদ মৌসুমেও আগের তুলনায় অনেক কম লঞ্চ নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করেছে।

কম সময়ে বাসে ঢাকা, তাই লঞ্চে যাত্রী সংকট

লঞ্চে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে সাধারণত ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। বিপরীতে পদ্মা সেতু হয়ে সড়কপথে এর তুলনায় অনেক কম সময়ে রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব। ফলে সময় বাঁচাতে অনেক যাত্রী এখন বাসকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

শুধু সময় নয়, লঞ্চের সেবার মান নিয়েও যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশসহ নানা কারণে অনেকেই আগের মতো লঞ্চে আগ্রহী নন। ফলে অনেক লঞ্চ ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রীও পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে যাত্রী সংকটের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

লঞ্চ মালিকদের হিসাবে, একটি বিলাসবহুল লঞ্চের বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল রাউন্ড ট্রিপে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। অথচ অধিকাংশ ট্রিপে লঞ্চপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এরপরও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখতে অনেক মালিক বাধ্য হয়ে লঞ্চ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিক্রি হয়ে গেল সুরভী-৭

নৌপথের চলমান সংকটের সাম্প্রতিক উদাহরণ বিলাসবহুল লঞ্চ এমভি সুরভী-৭। প্রায় দুই যুগ আগে নির্মিত এ লঞ্চটি চলতি বছরের জুনে বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় মালিকপক্ষ। প্রথমে ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা দাম চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, লঞ্চটি পরিচালনার জন্য বিক্রি করা হলেও পরে নতুন মালিক ঢাকার একটি শিপইয়ার্ডে নিয়ে সেটি ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করেন। যাত্রী সংকট ও দীর্ঘদিনের লোকসানই এর পেছনে অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পদ্মা সেতু চালুর পর গত চার বছরে সুরভী-৭সহ ডজনখানেক বিলাসবহুল লঞ্চ বিক্রি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কোনো কোনো লঞ্চ আবার শিপইয়ার্ড বা ডকইয়ার্ডে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর ফলে শুধু লঞ্চ ব্যবসাই সংকটে পড়েনি, কর্মহীন হয়েছেন নৌযানশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ।

ভাড়া কমিয়েও ফিরছে না যাত্রী

যাত্রী ধরে রাখতে বিভিন্ন সময় লঞ্চ মালিকরা ভাড়াও কমিয়েছেন। তিনতলা লঞ্চে ডেকের ভাড়া ৩৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। চারতলা লঞ্চেও কমানো হয়েছে ভাড়া। ভিআইপি, বিজনেস ক্লাস, কেবিন ও সোফার ভাড়াতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে সরকার নির্ধারিত ডেক ভাড়া ৪০৭ টাকা। তবে যাত্রী সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ে অনেক লঞ্চে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, এমনকি এর চেয়েও কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে ঈদের সময় যাত্রী বাড়লে ভাড়া সরকার নির্ধারিত হারের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের লোকসানও অনেক সময় ঈদ মৌসুমের আয়ে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন মালিকরা।

রোটেশন পদ্ধতিতে চলছে লঞ্চ

সব লঞ্চ একসঙ্গে চালালে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ে। তাই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মালিকরা রোটেশন পদ্ধতিতে কিছু লঞ্চ চালু রেখে বাকিগুলো বসিয়ে রাখছেন। এতে একটি লঞ্চকে নিয়মিত ট্রিপ দেওয়ার বদলে কয়েক দিন পরপর চলতে হচ্ছে।

আগেও এ রুটে প্রতিদিন একাধিক লঞ্চ চলাচল করলেও পদ্মা সেতু চালুর পর সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌপথে যাত্রী কমার বিষয়টি একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংকটে জাহাজ নির্মাণ শিল্পও

নৌপথে লঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও। কীর্তনখোলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা বড় শিপইয়ার্ডসহ অনেক ডকইয়ার্ডে আগের মতো কাজ নেই। নতুন লঞ্চ নির্মাণ কমে যাওয়ায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নতুন লঞ্চ নির্মাণে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পুরোনো লঞ্চ বিক্রি কিংবা স্ক্র্যাপ হিসেবে ভেঙে ফেলার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর দাবি

লঞ্চযাত্রী শাহ নেওয়াজ বলেন, লঞ্চের সেবা আগের মতো নেই। অনেক লঞ্চ অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পরিচালনা করা হচ্ছে। খাবারের মানও আগের মতো ভালো নয়। এসব কারণে যাত্রীদের মধ্যে লঞ্চ ভ্রমণের আগ্রহ কমেছে।

সুরভী শিপিং লাইনস ও শিপইয়ার্ডের পরিচালক রেজিন উল কবির বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় যাত্রী অনেক কম হওয়ায় লঞ্চ মালিকরা লোকসানে রয়েছেন। যাত্রীসেবার মান বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেকারত্ব ঠেকাতে লঞ্চ চালু রাখতে হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে লঞ্চের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে।

এমভি অ্যাডভেঞ্চার লঞ্চের কেবিন ইনচার্জ জাহিদ বলেন, প্রতি ট্রিপে অনেক সময় পরিচালন ব্যয়ও উঠে আসে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে লঞ্চশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নদীবন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে পন্টুনসহ নদীতে নিরাপদ যাত্রী চলাচলের জন্য কাজ করছে বিআইডব্লিউটিএ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি কম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে এর ফলে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী নৌপথ ও লঞ্চশিল্প যে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, সময় কমানো, ভাড়া কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং নৌপথকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় বরিশাল-ঢাকা নৌপথে বিলাসবহুল লঞ্চের সেই পুরোনো ব্যস্ততা শুধুই স্মৃতি হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: যুগান্তর