বরিশাল ০৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
গৌরনদীতে ৭৩ দিনে কোরআনের হাফেজ হয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করল ১৩ বছরের মুসাইব আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে দুজনকে হত্যা : হাসানাত আবদুল্লাহসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে দুই ওসির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ এক পা হারিয়েও থামেনি বরিশালের সামিয়া, প্রতিকূলতা জয় করে এসএসসিতে সাফল্য উজিরপুরে নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় আটক ছাত্রদল নেতা, অতঃপর গণধোলাই বরিশাল জেলা জজ আদালতের ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা বিভাগ বরিশাল, জেলা পটুয়াখালী বরিশালের উজিরপুরে ক্লাস চলাকালে শিক্ষকের মাথায় ছাদের পলেস্তারা লোডশেডিংয়ে দিশেহারা বরিশালের মানুষ, প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল গৌরনদীতে পাচারকালে ১৫ বস্তা সার জব্দ, ডিলারকে জরিমানা সূর্যাস্তের পর শিক্ষার্থীদের আড্ডা নিষেধ, সন্ধ্যার আগেই শেষ করতে হবে কোচিং

তিন দশক ধরে অচল বরিশাল নগরীর ট্রাফিক সিগন্যাল

Agailjhara Post
  • ০৪:৫০:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
  • / 44

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়। বরিশাল নগরের ব্যস্ত মোড়গুলোতে লাল, হলুদ আর সবুজ বাতির ঝলকানি ছিল নাগরিক আধুনিকতার এক অনন্য প্রতীক। যান চলাচলে আধুনিক শৃঙ্খলা আনতে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শহরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছিল ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি। কিন্তু তিন দশকের ব্যবধানে সেই বাতিগুলোর অস্তিত্ব আজ বিলীন। প্রবীণদের স্মৃতিতে এটি আজ এক ধূসর অতীত, আর নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্প।

নগরের সড়ক বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে বরিশাল শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক রূপ দিতে মোট ২৮টি ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

প্রাথমিক ধাপ হিসেবে নগরের সাতটি অতিগুরুত্বপূর্ণ মোড়কে বেছে নেওয়া হয়। এসব সিগনাল বসানো হয় নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, জেলখানা মোড়, কাকলী মোড়, জিলা স্কুল মোড়, সিঅ্যান্ডবি রোডের চৌমাথা এবং লঞ্চঘাট এলাকায়। সে সময় এটি ছিল বরিশালের জন্য এক যুগান্তকারী উদ্যোগ।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ আগ্রহের এই প্রকল্পটির কাজ এই সাতটি মোড়েই থমকে যায়। পরবর্তী সময়ে সামান্য রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, চরম অব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে একে একে সিগন্যালগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। সময়ের ব্যবধানে খুঁটিগুলোও উপড়ে ফেলা হয়।

গত ৩০ বছরে বরিশালের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তবে সেই অনুপাতে বাড়েনি নাগরিক সুবিধা।

বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, “এক সময়ের মাত্র ২৪ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটারের পৌরসভা এখন ৫৮ বর্গকিলোমিটারের বিশাল সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়েছে। জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিক না করে আমরা পড়ে আছি সেই মান্ধাতা আমলেই। ফলে যানজট এখন বরিশালের মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ।”

নগরের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ্যাত্ব নিয়ে বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিচুর রহমান খান স্বপন ক্ষোভের সাথে বলেন, “গত তিন দশকে পৌরসভা সিটি করপোরেশন হয়েছে, গঠন করা হয়েছে আধুনিক মেট্রোপলিটন পুলিশও। কিন্তু আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর মতো অতিপ্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ গত ৩০ বছরেও কোনো প্রশাসন নিতে পারেনি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

নগরের কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা সুব্রত পাল বাপ্পী প্রায় তিন দশক আগের সেই শৃঙ্খলিত বরিশালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমরা যখন সাইকেলে চেপে কলেজে যেতাম, তখন জেলখানা মোড়ে লাল, সবুজ আর হলুদ বাতি জ্বলতে দেখতাম। লাল বাতি জ্বললে মানুষ নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে যেত, সবুজ জ্বললে চলত। পুরো সড়কে একটা চমৎকার স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলা ছিল। আজ ৩০ বছর ধরে বরিশালের মানুষ সেই দৃশ্য আর চোখে দেখে না। এখন মোড়ে মোড়ে শুধু ট্রাফিক পুলিশের লাঠির বাড়ি আর হাতের ইশারার বিশৃঙ্খলা।

বর্তমানে শহরের ট্রাফিক জট নিরসন ও সড়ক আধুনিকায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন আশার কথা শোনান।

তিনি জানান, “যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ওভারব্রিজ (পদচারী সেতু) নির্মাণের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার পরিকল্পনাও প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে।”

তবে বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হিসেবে তিনি আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দেশি ও বিদেশি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় তহবিল বা সরকারি বরাদ্দ পেলে খুব দ্রুতই বরিশালে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

একটি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতির নিজের হাত দিয়ে শুরু করা একটি আধুনিক উদ্যোগ কীভাবে সমন্বয়হীনতা ও চরম অবহেলায় হারিয়ে যেতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ বরিশালের এই অচল ট্রাফিক ব্যবস্থা। বরিশালবাসী আশা করে, এই তিলোত্তমা নগরী আবারও তার হারানো শৃঙ্খলা ফিরে পাবে; ঢাকার মতো বরিশালের সড়কগুলোও নিয়ন্ত্রিত হবে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক প্রযুক্তিতে।

নিউজটি শেয়ার করুন

তিন দশক ধরে অচল বরিশাল নগরীর ট্রাফিক সিগন্যাল

০৪:৫০:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়। বরিশাল নগরের ব্যস্ত মোড়গুলোতে লাল, হলুদ আর সবুজ বাতির ঝলকানি ছিল নাগরিক আধুনিকতার এক অনন্য প্রতীক। যান চলাচলে আধুনিক শৃঙ্খলা আনতে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শহরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছিল ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি। কিন্তু তিন দশকের ব্যবধানে সেই বাতিগুলোর অস্তিত্ব আজ বিলীন। প্রবীণদের স্মৃতিতে এটি আজ এক ধূসর অতীত, আর নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্প।

নগরের সড়ক বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে বরিশাল শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক রূপ দিতে মোট ২৮টি ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

প্রাথমিক ধাপ হিসেবে নগরের সাতটি অতিগুরুত্বপূর্ণ মোড়কে বেছে নেওয়া হয়। এসব সিগনাল বসানো হয় নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, জেলখানা মোড়, কাকলী মোড়, জিলা স্কুল মোড়, সিঅ্যান্ডবি রোডের চৌমাথা এবং লঞ্চঘাট এলাকায়। সে সময় এটি ছিল বরিশালের জন্য এক যুগান্তকারী উদ্যোগ।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ আগ্রহের এই প্রকল্পটির কাজ এই সাতটি মোড়েই থমকে যায়। পরবর্তী সময়ে সামান্য রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, চরম অব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে একে একে সিগন্যালগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। সময়ের ব্যবধানে খুঁটিগুলোও উপড়ে ফেলা হয়।

গত ৩০ বছরে বরিশালের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তবে সেই অনুপাতে বাড়েনি নাগরিক সুবিধা।

বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সভাপতি শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, “এক সময়ের মাত্র ২৪ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটারের পৌরসভা এখন ৫৮ বর্গকিলোমিটারের বিশাল সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়েছে। জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিক না করে আমরা পড়ে আছি সেই মান্ধাতা আমলেই। ফলে যানজট এখন বরিশালের মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ।”

নগরের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ্যাত্ব নিয়ে বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিচুর রহমান খান স্বপন ক্ষোভের সাথে বলেন, “গত তিন দশকে পৌরসভা সিটি করপোরেশন হয়েছে, গঠন করা হয়েছে আধুনিক মেট্রোপলিটন পুলিশও। কিন্তু আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর মতো অতিপ্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ গত ৩০ বছরেও কোনো প্রশাসন নিতে পারেনি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

নগরের কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা সুব্রত পাল বাপ্পী প্রায় তিন দশক আগের সেই শৃঙ্খলিত বরিশালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমরা যখন সাইকেলে চেপে কলেজে যেতাম, তখন জেলখানা মোড়ে লাল, সবুজ আর হলুদ বাতি জ্বলতে দেখতাম। লাল বাতি জ্বললে মানুষ নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে যেত, সবুজ জ্বললে চলত। পুরো সড়কে একটা চমৎকার স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলা ছিল। আজ ৩০ বছর ধরে বরিশালের মানুষ সেই দৃশ্য আর চোখে দেখে না। এখন মোড়ে মোড়ে শুধু ট্রাফিক পুলিশের লাঠির বাড়ি আর হাতের ইশারার বিশৃঙ্খলা।

বর্তমানে শহরের ট্রাফিক জট নিরসন ও সড়ক আধুনিকায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন আশার কথা শোনান।

তিনি জানান, “যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ওভারব্রিজ (পদচারী সেতু) নির্মাণের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার পরিকল্পনাও প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে।”

তবে বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হিসেবে তিনি আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দেশি ও বিদেশি আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় তহবিল বা সরকারি বরাদ্দ পেলে খুব দ্রুতই বরিশালে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

একটি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতির নিজের হাত দিয়ে শুরু করা একটি আধুনিক উদ্যোগ কীভাবে সমন্বয়হীনতা ও চরম অবহেলায় হারিয়ে যেতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ বরিশালের এই অচল ট্রাফিক ব্যবস্থা। বরিশালবাসী আশা করে, এই তিলোত্তমা নগরী আবারও তার হারানো শৃঙ্খলা ফিরে পাবে; ঢাকার মতো বরিশালের সড়কগুলোও নিয়ন্ত্রিত হবে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক প্রযুক্তিতে।