হরমুজ নিয়ন্ত্রণে জোর ইরানের, সমঝোতা বাস্তবায়ন না হলে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি
- ০৭:২৫:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
- / 44
পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা বের হওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায় এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছে ইরান।
প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইরানের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একথা জানিয়েছেন।
ওদিকে, দ্বিতীয় দফার শান্তিবৈঠক কবে হবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনও ঘোষণা না আসার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কলিবফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা চুক্তি (মউ) বাস্তবায়ন না করে তাহলে তেহরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
তিনি এও জানান, ওয়াশিংটন যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তবে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগোবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিন মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে চলতি মাসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি সই হয়।
এরপর তেল ইরানের তেল রপ্তানির ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাকের বলেন, ‘‘হরমুজ় প্রণালিতে অবরোধ উঠে যাওয়ার পর থেকে ইরান চার কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে।’’
তিনি জানান, হরমুজ়ের উপর ইরান এবং ওমানের কর্তৃত্ব রয়েছে। ওই জলপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে বাকের বলেন, ‘‘বিনামূল্যে হরমুজ দিয়ে ৬০ দিন যাতায়াত করতে পারবে পণ্যবাহী জাহাজগুলো। ইরান কোনও অবস্থাতেই হরমুজের উপর নিজেদের অধিকার ছেড়ে দেবে না। এটা আমদের আঞ্চলিক জলসীমা।’’
সমঝোতা চুক্তির অধীনে, ইরান আগামী ৬০ দিন কোনও টোল ছাড়াই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরানের বিশ্বাস, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোন কোন জাহাজ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যাবে এবং কোন রুট ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা তাদের হাতেই রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই প্রণালির ওপর স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায় তেহরান। দেশটির সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় এই বিষয়ে কোনো রফা না হওয়া পর্যন্ত ইরানি আলোচকেরা অন্য কোনো বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন না।
যদি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ না বাড়ে, তবে আগামী অগাস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় শুরু করবে ইরান। তবে কী পরিমাণ টোল নেওয়া হবে বা কীভাবে আদায় করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
সংঘাত শুরুর সময় ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল এবং ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, পারস্য উপসাগর ছাড়ার সময় কিছু জাহাজ থেকে নৌ-চলাচল কিংবা অন্যান্য টোল আদায় করা হয়েছিল।
হরমুজে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ ও টোলের প্রভাব:
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ ও টোল আরোপের ফলে বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের খরচ, বিলম্ব এবং ঝুঁকি বাড়বে। অথচ সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।
প্রণালিটিতে আগে কখনো টোল নেওয়া হতো না। তাই তেহরানের এই অবস্থান ১৭ জুনের অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারকের মার্কিন ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও আন্তর্জাতিক জলপথে টোল আরোপ বা জাহাজ চলাচল খর্ব করার সুযোগ কোনো দেশের নেই।
তবে ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির আওতায় ফি আদায় না করলেও প্রণালির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অধিকার তাদের রয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে তারা বাধ্য নয়।
ওমানের সঙ্গে ট্রানজিট পরিকল্পনা ও সংঘাত:
হরমুজের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত ওমানের সঙ্গে ট্রানজিট রুট নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে ইরান। তবে গত সপ্তাহান্তে ওমান সীমানা দিয়ে অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টাকালে চারটি জাহাজে গুলি চালিয়েছে ইরানি বাহিনী, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র গোলাগুলি হয়।
এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা জানান, তারা পরিস্থিতি সংঘাত-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতে দেবেন না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার রুট ইরানই নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি, নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ মনে হলে যেকোনো জাহাজের প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান এবং বাধ্যতামূলক সেবার জন্য টোল আদায় করবে তেহরান।
ইরানের সামনে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফেরার পর একে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আদায়ের ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে দেখছে তেহরান। তাদের দাবি না মানলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তা চাপিয়ে দিতেও প্রস্তুত তারা।
এমনকি এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হলেও তারা পিছিয়ে আসবে না। ইরানের ধারণা, বাড়তি খরচ এড়াতে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনসহ সব দেশই তাদের এই ব্যবস্থাপনা মেনে নেবে।
হিসাব-নিকাশে ভুল ও আন্তর্জাতিক আইন:
তবে সেন্ট অ্যান্ড্রুস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলি আনসারি মনে করেন, ইরান হয়ত ক্ষমতার অতিরিক্ত চাল চালছে এবং ওয়াশিংটনের মনোভাব অনুমানে ভুল করছে। কোনো পক্ষই নিজেদের পরাজিত মনে না করায় এখানে আবারও তীব্র সংঘাতের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর না করলেও ওমান করেছে, যা এই প্রণালিতে মুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের অধিকার দেয়। এই কনভেনশনটিকে বেশিরভাগ দেশ প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে গণ্য করে।
নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ক্রিস ও’ফ্ল্যাহার্টি জানান, অন্যান্য সামুদ্রিক কনভেনশনের তিন মাইলের পরিবর্তে এই চুক্তির অধীনে বারো মাইল জলসীমা দাবি করে ইরান মূলত সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আইনকে চ্যালেঞ্জ করছে। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি তার সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে বিশ মাইলের কিছু বেশি চওড়া।
শর্ত পূরণ না হলে আলোচনার পথ বন্ধ:
ইরানের বর্তমান বৈঠকগুলোর লক্ষ্য হলো সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা। এর শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইরান পরবর্তী কোনো আলোচনায় বসবে না বলে গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান দেশটির শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।
কলিবফ বলেন, ওমানের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানেরও সার্বভৌমত্ব রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অধিকারের বিষয়ে ইরান কখনোই কোনো আপস করবে না। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এই প্রণালি দিয়ে কোনো খরচ ছাড়া চলাচল কেবল ষাট দিনের জন্যই প্রযোজ্য।
সাক্ষাৎকারে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে কলিবফ বলেন, “আমরা সংলাপের পক্ষে, তবে সংলাপ সফল না হলে আমরা যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত এবং সেই অনুযায়ী জবাব দেব।”


























