মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ বিজয়কে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আধুনিক মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ওয়াশিংটনে রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে ভোটাররা ট্রাম্পের ক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা, ইরানে অজনপ্রিয় যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং মুখোশধারী সরকারি এজেন্টদের মাধ্যমে অভিবাসীদের ধরপাকড়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের বিজয় ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো রাজ্যে সিনেট নির্বাচনে জয় এবং বিভিন্ন রাজ্যে গভর্নর পদে সাফল্যের মধ্য দিয়ে দলটি প্রত্যাশার চেয়েও বড় রাজনৈতিক অর্জন করেছে।
নির্বাচনের ফল এতটাই ব্যবধানপূর্ণ ছিল যে, ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়কে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার প্রচলিত প্রবণতাও এবার কার্যকর হয়নি। নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করতে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য উদ্যোগের আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো অভিযান দেখা যায়নি। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর সৃষ্ট বিতর্কের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও কমেছে। ডেমোক্র্যাটদের বিপুল ব্যবধানের জয়কে কারচুপির মাধ্যমে উল্টে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্পের দুই মেয়াদে মার্কিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক চাপের মুখে পড়লেও এবারের নির্বাচনের ফল তাঁর ক্ষমতার ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের চিত্র স্পষ্ট হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্পকে তুলনামূলক সংযত ও নমনীয় দেখা গেছে। নির্বাচনের আগের দিন নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো’ হিসেবে অভিহিত করা ট্রাম্প এবার ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সম্প্রতি যাদের তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, তাদের সঙ্গেই সমঝোতার কথা বলেছেন তিনি।
পলিটিকোর নির্বাচনী রাতের সরাসরি সম্প্রচারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব, যাতে আমাদের দেশের সবকিছু ভালোভাবে এগিয়ে যায়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ পরাজয়ের পর ট্রাম্প দাবি করেন, রিপাবলিকান প্রার্থীরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতির কারণ হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা তাঁর মতো হতে পারেননি বলেই পরাজিত হয়েছেন। তবে নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
নির্বাচনকে কার্যত নিজের জনপ্রিয়তার প্রশ্নে পরিণত করেছিলেন ট্রাম্প। অথচ তাঁর জনসমর্থনের হার ছিল অত্যন্ত কম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্কও ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাখো মার্কিন পরিবার আর্থিক চাপের মুখে পড়ে।
নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নির্বাচনে বড় ভুল হিসেবে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্বর্ণযুগে’ নিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণের তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত বলে যে দাবি তিনি করেছেন, তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের আসন কমানোর যে উদ্যোগ ট্রাম্প নিয়েছিলেন, সেটিও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং তাঁর অজনপ্রিয়তার কারণে বিভিন্ন এলাকায় রিপাবলিকান প্রার্থীরাই পরাজিত হয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের ক্ষমতা কতটা
মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট আইন প্রণয়ন এবং সরকারি ব্যয় অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করে। তবে কোনো কক্ষই এককভাবে আইন পাস করতে পারে না। উভয় কক্ষের কিছু স্বতন্ত্র সাংবিধানিক ক্ষমতাও রয়েছে। সিনেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো প্রেসিডেন্টের মনোনীত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদন করা। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের মনোনীত রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগও রয়েছে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পায়। এসব কমিটি সরকারি কার্যক্রম তদন্ত, নথিপত্র তলব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সমন জারি করতে পারে। এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে কোনো প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা অভিশংসিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে সিনেট। এই বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ ও ২০২১ সালে দুইবার প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন। তবে উভয়বারই সিনেটে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও প্রভাব বাড়াবে। কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষেই পাস হতে হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট তাতে স্বাক্ষর করবেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে থাকছে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর মতো দ্বিদলীয় সমর্থন থাকা কোনো প্রস্তাবও ট্রাম্পের ভেটোর মুখে পড়তে পারে। সোমবার একটি পডকাস্টে ট্রাম্প বলেন, “আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব। ” প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ফলে এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের কিছু রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থন আদায় করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রস্তুতি
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তে সাংবিধানিক ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘সময়ক্ষেপণ এবং সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনার পরিমাণ বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটরা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রের তুলনায় অনেক বেশি তৎপরতা দেখাবে এই তদন্তের জায়গাতেই।’
সিনেটের পার্মানেন্ট সাবকমিটি অন ইনভেস্টিগেশন্সে বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। নির্বাচনের ফলাফলের কারণে তিনি এই কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্লুমেনথাল বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগাবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই আমাদের সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহার করব।’
কংগ্রেসের তদন্তের জন্য হোয়াইট হাউসের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ফলে এসব তদন্ত ট্রাম্পের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে গত দুই বছরে ট্রাম্পের পরিবার ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেডিকশন মার্কেটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক স্বার্থ সম্প্রসারণ করেছে।
চলতি বছর প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য তদন্তের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কয়েকজন সিনেটর বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব চিঠিতে হোয়াইট হাউসে বলরুম নির্মাণের জন্য ট্রাম্পের আহ্বানে সংগৃহীত ব্যক্তিগত অনুদান এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে তদন্তে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে সিনেটের সমন আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এতে তদন্ত কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লরা ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সদস্যরা সমনের জবাব দিতে হাজির হবেন না। তবে সরকারি কর্মচারী এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের।
এসব সাক্ষ্য ও নথিপত্রের মাধ্যমে ট্রাম্প এবং তাঁর মিত্রদের সম্ভাব্য অনিয়ম উদ্ঘাটন করতে পারে কংগ্রেস। তবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলেও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত নয়। ডেমোক্র্যাটরা সম্ভাব্য অপরাধের প্রমাণ প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠাতে পারবেন। কিন্তু মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্পের বিচার বিভাগকে।
অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিশংসনের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি ভোটারদের সরাসরি প্রভাবিত করা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। মঙ্গলবার দ্য হিলকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেলডন হোয়াইটহাউস বলেন, “তদন্তের কাজ কোথায় পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে আমাদের বিচক্ষণ ও কৌশলী হতে হবে। একই সঙ্গে আমেরিকান পরিবারগুলো যে তাৎক্ষণিক জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তা সমাধানের কাজ থেকে তদন্ত যেন আমাদের মনোযোগ সরিয়ে না নেয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ”
ইরান যুদ্ধ বন্ধে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা কী হবে
ডেমোক্র্যাটরা আগামী ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। ফলে এর আগের দুই মাস ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা গ্রহণের আগেই ইরানে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘অপমান ও পরাজয়ের মুখে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, এমন একটি প্রবণতা তাঁর মধ্যে আমরা দেখেছি।’
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন পারসি। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের জন্য আগে থেকে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় অব্যাহত রাখতে পারবে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দ আটকে দিতে পারেন। পারসি বলেন, ‘এতে তিনি কত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন, তার ওপর একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তাঁর যদি আরও অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা এমন কোনো সামান্য অঙ্কের কথা বলছি না, যা তিনি সহজেই অন্য খাত থেকে সরিয়ে নিতে পারবেন।’
তবে নতুন বাজেট বিল পাস করতে হলে ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভেটো অতিক্রম করার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সামরিক ব্যয় সীমিত করার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। লরা ব্লেসিং বলেন, মার্কিন সেনাদের দুর্বল করার অভিযোগ ওঠার আশঙ্কায় ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহাসিকভাবেই সামরিক অর্থায়ন বন্ধ বা সীমিত করতে অনীহা দেখিয়ে এসেছেন।
তবে যুদ্ধ বন্ধে চাপ সৃষ্টির জন্য তাঁদের হাতে বিকল্প পথ রয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে তাঁরা ইরান যুদ্ধ এবং হামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আইনের শাসন ও আইনি বিধিবিধান অনুসরণ করেছে কি না, তা তদন্ত করতে পারেন।
স্বাধীন নজরদারি সংস্থা প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইটের নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ডেভিড জানোভস্কি বলেন, ‘কঠোর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদারকি নিজে থেকেই সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পারবে না। তবে এর মাধ্যমে যুদ্ধের রাজনৈতিক ব্যয় এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, যা প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা আর বহন করতে চাইবেন না।’
যুদ্ধ সীমিত করার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা ঐক্যবদ্ধ হবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পারসি সতর্ক করে বলেছেন, দলটি যদি ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ না নেয়, তাহলে যুদ্ধের রাজনৈতিক দায় তাদেরও নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না। তাঁদেরও এই যুদ্ধের দায় নিতে হবে। কারণ, যুদ্ধ বন্ধ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিষ্ক্রিয় থাকবেন এবং এর ফলে তাঁরাও দায়ে জড়িয়ে পড়বেন।’
জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কী করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক সংকট ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডিন বেকারের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সিনেটে তদন্ত শুরু হলে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে পেট্রলের দাম কমতে এবং পরিবারের ব্যয়ের চাপ কিছুটা লাঘব হতে পারে বলে মনে করেন বেকার।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
২০২৫ সালে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিককে স্বাস্থ্যবিমার জন্য বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ভর্তুকি পুনর্বহালের চেষ্টা করতে পারেন। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে করা কাটছাঁট প্রত্যাহারের উদ্যোগও নিতে পারেন।
বেকারের মতে, সরকারি ব্যয় নিয়ে আলোচনার সময় এসব বিষয়ে রিপাবলিকানদের সম্মত করতে চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগে দ্বিদলীয় সমর্থন ও জনসাধারণের ব্যাপক সমর্থন থাকায় ট্রাম্পের পক্ষে এ ধরনের প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে। বেকার বলেন, ‘তাঁরা এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন, যাতে ট্রাম্প নিজেই বিলটিতে ভেটো দিতে চাইবেন না।’
এ ছাড়া ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে এর জন্য প্রতিনিধি পরিষদের সমর্থন এবং ট্রাম্পের সম্মতি অথবা তাঁর ভেটো অকার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত ভোট প্রয়োজন হবে। শুল্ক প্রত্যাহার করা সম্ভব হলেও পণ্যের দাম দ্রুত কমবে না বলে সতর্ক করেছেন গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতিবিষয়ক ও প্রচার কার্যক্রমের প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ। তিনি বলেন, ‘দাম রকেটের মতো ওপরে ওঠে, আর পালকের মতো ধীরে ধীরে নিচে নামে।’
ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়াও উচ্চমূল্য মোকাবিলায় ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি সুযোগ রয়েছে। সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় তাঁরা মুদি পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া এবং বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবেন। আল জাজিরাকে জ্যাকেজ বলেন, ‘কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হাতে থাকা, প্রধান নির্বাহীদের সমন জারি করা এবং কংগ্রেসের সামনে হাজির করতে পারার মাধ্যমে বাস্তব ও উল্লেখযোগ্য ফল অর্জনের অনেক নজির রয়েছে।’
রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের দায় ট্রাম্পের
২০২৪ সালে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তাঁর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত রিপাবলিকান পার্টির এই নির্বাচনী বিপর্যয়কে বড় রাজনৈতিক পতন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার নির্বাচনের রাত যত এগিয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের চিত্র তত স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে জয়, সাউথ ক্যারোলিনা ও টেক্সাসের মতো রাজ্যে সিনেট নির্বাচনে সাফল্য এবং একাধিক গভর্নর পদে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি প্রত্যাশার চেয়েও বড় অর্জন করেছে। ট্রাম্প যেসব প্রার্থীকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে সমর্থন দিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই পরাজিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন এবং দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর ডারলেইন গ্রাহাম, যিনি তাঁর প্রয়াত ভাইয়ের ছেড়ে যাওয়া আসন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এ ছাড়া মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেই বা মাগা মতাদর্শের প্রতি যথেষ্ট অনুগত নন, এমন অভিযোগে ট্রাম্পের দল সিনেটর জোনি আর্নস্ট ও থম টিলিসকে রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল। তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিলে রিপাবলিকানরা হয়তো আইওয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনায় নিজেদের আসন ধরে রাখতে পারত। সিএনএনের জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ট্রাম্পের যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নীতি, অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং নেতৃত্বের বিরোধিতা করেন।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে প্রজন্মের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক প্রতিভা হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটির দাবি, রিপাবলিকান পার্টির তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে। প্রচলিত ধারার কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে যে রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়, ট্রাম্প তা অর্জন করতে পারেন বলেও তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন।
এই দাবির কিছু ভিত্তি থাকলেও মঙ্গলবারের নির্বাচনে তাঁর সেই রাজনৈতিক দক্ষতা কার্যত অনুপস্থিত ছিল। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ১০ বছর পর দেশের সবচেয়ে কট্টর রিপাবলিকান-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দলীয় প্রার্থীদের রক্ষায় টানা এক মাসের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই নির্বাচনী প্রত্যাখ্যানের সবচেয়ে বড় উদাহরণ টেক্সাস। সেখানে প্রায় চার দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সিনেট আসন জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। একই রাজ্যে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও পরাজিত হয়েছেন। চতুর্থ মেয়াদে গভর্নর হওয়ার প্রচেষ্টায় তাঁকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনজীবী জিনা হিনোজোসা।
ট্রাম্পের অনেক সমালোচক তাঁর রাজনৈতিক উত্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার ফল হিসেবে দেখেন। ট্রাম্পের বর্ণবাদী বক্তব্য, শ্বেতাঙ্গ সংস্কৃতির প্রতি পক্ষপাতমূলক অবস্থান এবং সংখ্যালঘু নারী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তবে এবারের নির্বাচনে মার্কিন রাজনীতির পরিবর্তনশীল চরিত্র আবারও প্রকাশ পেয়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে টেক্সাসের প্রথম লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন হিনোজোসা। জর্জিয়ায় দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন কেইশা ল্যান্স বটমস। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলা করে সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম সদস্য হতে যাচ্ছেন আবদুল এল-সায়েদ। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু দলের নেতা হাকিম জেফরিস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে রয়েছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট নন ট্রাম্প। ২০১০ সালে বারাক ওবামা নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিলেন, যাকে তিনি ‘শেল্যাকিং’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশও ‘থাম্পিন’ বা বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের অজনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছিল।
তবে ২০২৬ সালের পরাজয় ট্রাম্পের জন্য বিশেষভাবে ব্যক্তিগত। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতায় থাকার যুক্তির বড় অংশই গড়ে উঠেছে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরার ওপর। অথচ এবার তাঁকে আধুনিক মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম লজ্জাজনক পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। যদি থাকতাম, তাহলে আমরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হতাম! বিষয়টির প্রতি আপনাদের মনোযোগের জন্য ধন্যবাদ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’ তবে তাঁর এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আইওয়ার এক জনসভায় ট্রাম্প বলেছিলেন, “ধরে নিন, আমি ব্যালটে আছি। কারণ, কার্যত আমিই ব্যালটে আছি। ”
নতুন কংগ্রেস ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা
নির্বাচনের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে। আগামী বছর নতুন ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তদন্ত শুরু করতে পারে। তদন্তের আওতায় আসতে পারে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, ইরান যুদ্ধ, হোয়াইট হাউসের দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়ে দেওয়া বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ দুই বছরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো পদ শূন্য হলে নতুন বিচারপতি নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। একইভাবে তাঁদের বিরোধিতা রয়েছে, এমন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ অনুমোদনও বাধাগ্রস্ত করতে পারবেন তাঁরা।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র দলীয় সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করেছে। কার্যত তিনি এখন একজন ‘লেম ডাক’ বা ক্ষমতা হারাতে বসা প্রেসিডেন্ট। তবে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অস্থির ও বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প সহজে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবেন, এমন সম্ভাবনা কম।
বাজেট এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগে ট্রাম্প যদি ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে না পারেন, তাহলে এ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের এককভাবে দেশ পরিচালনার প্রচেষ্টা এবং তাঁর সহযোগীদের সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার জন্য ডেমোক্র্যাটদের জারি করা সমন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক বিরোধ তৈরি হতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসায় ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও অনিয়ন্ত্রিত ও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশার প্রায় সবকিছুই অর্জন করেছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখন বড় রাজনৈতিক সমস্যার মুখে। এত দিন তাঁকে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় তাঁকে ট্রাম্পের কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে হতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পুরোনো রিপাবলিকান পার্টির অবশিষ্ট অংশকে নিয়ে মাগা আন্দোলনের বাইরে নতুন কোনো রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে পারেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। একসময় তিনি নিজেই প্রচলিত রিপাবলিকান রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
অন্যদিকে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতো সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনে করতে পারেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো ব্যক্তি ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। একই সঙ্গে তিনি দলটির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগও তৈরি করতে পারেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের সামনেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচনী বিজয়ের উৎসব শেষ হলে তাঁদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ভোটারদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণ ক্ষমতা তাঁদের হাতে থাকবে না। কারণ, ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা ব্যর্থ হলে মাত্র দুই বছর পর ২০২৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁদেরও বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ, এই সংকট মোকাবিলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ট্রাম্প, উভয়েই ব্যর্থ হয়েছেন।
তথ্যসূত্র: সিএনএন ও আল জাজিরা
সূত্র: আজকের পত্রিকা

