বরিশালের গৌরনদীতে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব ভূমিসেবার বার্তা দিয়ে বিদায় নিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ মেহেদী হাসান। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) গৌরনদীতে কর্মদিবস শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন।
গৌরনদীতে ১ বছর ১ মাস ৮ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মেহেদী হাসান। দায়িত্ব পালনকালে ভূমি সেবা সহজীকরণ, গণশুনানি, বাজার মনিটরিং, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদক ও ইভটিজিংবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে বদলি হয়ে গৌরনদীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন মেহেদী হাসান। দায়িত্ব নেওয়ার পর ভূমি অফিসকে মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত করার কথা বলে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন তিনি।
“ভূমি সেবার শুদ্ধতাই কমাতে পারে সামাজিক বিরোধ”—এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে কাজ করার কথা জানান মেহেদী হাসান। সেবা নিতে আসা মানুষের কথা সরাসরি শোনা, তাদের সমস্যা বোঝা এবং স্বচ্ছ ও সহজভাবে ভূমি সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বল্প জনবল নিয়েও প্রায় শতভাগ শুনানি গ্রহণ, সরকারি ফি, সেবার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো এবং দালালমুক্ত ভূমি সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে বিদায়ী বার্তায় উল্লেখ করেন তিনি।
মানুষের অভিযোগ ও সমস্যার কথা সরাসরি শোনার জন্য “সাপ্তাহিক বৃহস্পতিবার: জনগণের কাছে এসিল্যান্ডের জবাব” শীর্ষক গণশুনানির আয়োজনের কথাও তুলে ধরেন মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, “একটি চেয়ারে বসে শুধু ফাইল দেখিনি; চেষ্টা করেছি মানুষের মুখ দেখতে, মানুষের কথা শুনতে, মানুষের কষ্ট বুঝতে।”
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও বিভিন্ন অভিযানে মাঠে ছিলেন তিনি। নির্বাচনী দায়িত্ব, বাজার মনিটরিং, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদক ও ইভটিজিং দমন, ভুয়া চিকিৎসক ও ভুয়া দলিলের বিরুদ্ধে অভিযান, বন্ধ হয়ে যাওয়া চলাচলের পথ উন্মুক্ত করা এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে কাজ করার কথা জানান তিনি।
দায়িত্ব পালনের সময় আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলেও বিদায়ী বার্তায় উল্লেখ করেন মেহেদী হাসান। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে কোনো একটি পক্ষের কাছে সিদ্ধান্ত অপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি, পরিচয় কিংবা প্রভাবের দিকে না তাকিয়ে সত্য, ন্যায় ও আইনের পক্ষে থাকার চেষ্টা করেছেন।
বিদায়ী বার্তায় তিনি বলেন, “কিছু বিদায় আসে দায়িত্বের নিয়মে, আর কিছু বিদায় হৃদয়ের ভেতর রেখে যায় দীর্ঘশ্বাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো এটি মাত্র ১ বছর ১ মাস ৮ দিন; কিন্তু হৃদয়ের পাতায় এ সময়টুকু অনেক দীর্ঘ, অনেক গভীর।”
গৌরনদীকে শুধু কর্মস্থল হিসেবে দেখছেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই জনপদ তাঁর কাছে এখন স্মৃতির একটি অধ্যায়, ভালোবাসার একটি ঠিকানা এবং অসংখ্য প্রিয় মানুষের আপন পৃথিবী।
দায়িত্ব পালনকালে কোনো সিদ্ধান্ত, কথা বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। মেহেদী হাসান বলেন, “কারণ দিন শেষে আমরা সবাই মানুষ। পদ থাকে না, চেয়ার থাকে না, দায়িত্বের পরিধিও থাকে না—থেকে যায় শুধু মানুষের মনে আমাদের আচরণের স্মৃতি।”
বিদায়ী বার্তায় গৌরনদীর মানুষের ভালোবাসার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “গৌরনদী ছেড়ে যাচ্ছি আমি, কিন্তু গৌরনদী আমার ভেতর থেকে কোথাও যাচ্ছে না। এই জনপদের মাটি, মানুষের মুখ, ভালোবাসা, অভিমান, হাসি আর অসংখ্য স্মৃতি—সবকিছুই আমার সঙ্গে থেকে যাবে।”
ভবিষ্যতে যে দায়িত্বেই থাকুন, গৌরনদীর মানুষের জন্য কিছু করার সুযোগ পেলে সেটিকে সৌভাগ্য হিসেবে দেখবেন বলেও জানান তিনি।
বিদায়ী বার্তার শেষে মেহেদী হাসান বলেন, “ভালো থাকুক গৌরনদী। ভালো থাকুক গৌরনদীর প্রতিটি মানুষ। ভালো থাকুক আমার চেনা সেই প্রিয় মুখগুলো। ভালো থাকুক এই জনপদের মাটি, মানুষ ও আগামী দিনের স্বপ্ন।”
এ সময় তিনি নিজের ও পরিবারের জন্য গৌরনদীবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন এবং গৌরনদীর মানুষের জন্যও দোয়া করবেন বলে জানান।

