প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর উপলক্ষে ৬১টি ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে কেব্ল স্থাপনে করা হয়। যেদিন এগুলো স্থাপন করা হয়, সেই রাতেই চুরি হয় ৪০০ ফুট কেব্ল। গত ১৯ অক্টোবর এই ঘটনা ঘটে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তবে এমন ঘটনা নতুন নয়। গত দেড় মাসে বিমানবন্দরে ২৫টি ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক তার এবং রানওয়ের আলোসংক্রান্ত সরঞ্জাম চুরির আরও ১১টি ঘটনা ঘটেছে। এই বিমানবন্দরে চারটি ইউনিটের অধীনে ৬৩৫ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এরপরও গুরুত্বপূর্ণ এমন স্থাপনায় চুরির ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গত ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে আসেন তারেক রহমান। তাঁর আগমন উপলক্ষে এসব ল্যাম্পপোস্ট সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ১৯ অক্টোবর সারা দিন কাজ করা হয় কেব্ল স্থাপনের। এরপর রাতেই সেগুলো চুরি হয়ে যায়।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গত ১৯ অক্টোবর রাতে বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকার প্রধান প্রবেশপথ জাপানি গেট থেকে ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি ওমনি-ডিরেকশনাল রেঞ্জ (ভিওআর) নেভিগেশন স্থাপনার দিকে যাওয়ার সড়ক থেকে প্রায় ৫০০ ফুট ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক কেব্ল চুরি হয়। মাটির প্রায় তিন ফুট গভীরে পুঁতে রাখা তারের আনুমানিক মূল্য ২ লাখ টাকা।
ভিওআর বিমানবন্দরের নেভিগেশন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি থেকে পাঠানো সংকেত উড়োজাহাজকে দিক নির্ণয় ও অবতরণ এবং উড্ডয়নের সময় পথনির্দেশনায় সহায়তা করে। তবে সর্বশেষ চুরির ঘটনায় ভিওআর নেভিগেশন যন্ত্রপাতি নয়, এর কাছাকাছি সড়কের বাতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের তার চুরি হয়েছে। চুরির স্থানটির কাছেই বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিজিবির হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার রয়েছে। ফলে এলাকাটির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, গত আগস্ট থেকে বিমানবন্দরে ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক তার এবং রানওয়ের আলোসংক্রান্ত সরঞ্জাম চুরির ১১টি ঘটনা ঘটেছে।
গত ২১ আগস্ট রানওয়ের ০৫ প্রান্ত থেকে একটি ট্রান্সফরমার এবং প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেব্ল কিট চুরি হয়। একই ঘটনায় ভূগর্ভস্থ তার, রানওয়ের বাতি, লাইট বেস ও লুপিং কেব্লও নিয়ে যায় চোরেরা। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর কার্গো গুদামের পশ্চিম সীমানা থেকে রানওয়ের ০৫ প্রান্তের দিকে প্রায় আধা কিলোমিটার নিরাপত্তাবাতির তার চুরি হয়। এতে ওই এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ অন্ধকার হয়ে পড়ে। সেই রাতে ভিওআর নেভিগেশন এলাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও চুরি হয়। এতে ওই এলাকাতেও আলোর ব্যবস্থা ব্যাহত হয় বলে বিমানবন্দর সূত্র জানায়।
গত ৮ সেপ্টেম্বর রানওয়ের ২৩ প্রান্ত থেকে অ্যাপ্রোচ লাইটের দুটি ট্রান্সফরমার এবং প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেব্ল কিট চুরি হয়। এরপর গত ১০ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে আরও তিনটি ট্রান্সফরমার ও সংশ্লিষ্ট তার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ১৩ সেপ্টেম্বর ২৩ প্রান্তের বোট ক্লাবের কাছে ছয়টি ট্রান্সফরমার এবং অ্যাপ্রোচ লাইটের বিভিন্ন প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেব্ল কিট চুরি হয়।
এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে পাঁচটি ট্রান্সফরমার ও তার এবং ৬ অক্টোবর আরও পাঁচটি ট্রান্সফরমার ও সংশ্লিষ্ট তার চুরির ঘটনা ঘটে। ১০ অক্টোবর রাতে ২৩ প্রান্ত থেকে আরও তিনটি ট্রান্সফরমার ও তার চুরি হয় বলে সূত্র জানায়।
রানওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার-ক্যামসে জয়েন্ট ভেঞ্চারের একটি চিঠিতেও সিম্পল অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেমের (এসএএলএস) বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির তথ্য উঠে এসেছে। গত ৫ অক্টোবর বিমানবন্দরের প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা জানতে পারে, সিম্পল অ্যাপ্রোচ সার্কিট-২ কাজ করছে না। পরে পরিদর্শনে এসএএলএস-০৭ অংশ থেকে পাঁচটি সিরিজ ট্রান্সফরমার, কিটসহ ২৫ মিটার সেকেন্ডারি কেব্ল, তিন মিটার খোলা তামার তার এবং ৩০ মিটার বডি-আর্থিং উপকরণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) জানানোর পর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
বারবার চুরির বিষয়ে শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাদশা মো. ফয়সাল চুরির কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা চোর ধরতে তৎপর রয়েছি। ইতিমধ্যে একজন চোরকে ধরা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।’
বিমানবন্দরের এই কর্মকর্তা দাবি করেন, যেসব এলাকায় চুরি হচ্ছে, সে এলাকাগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। নিরাপত্তা বিভাগে এত লোক থাকার পরও ট্রান্সফরমার, কেব্ল ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির মন্তব্য না করে জনসংযোগ বিভাগে কথা বলতে বলেন।
এই বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের মেম্বার (সিকিউরিটি) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় আরও ৬০ আনসার দেওয়া হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা

