বরিশালের গৌরনদীর চাঁদশী গ্রামে জন্ম নেওয়া কাদম্বিনী বসু (গাঙ্গুলী) ছিলেন উপমহাদেশের নারীশিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই ব্রজকিশোর বসু ও তাঁর পরিবারের ঘরে জন্ম নেন তিনি। ডাকনাম ছিল বিনি। বাবা ব্রজকিশোর বসু বিহারের ভাগলপুর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বাবার উৎসাহেই ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় কাদম্বিনীর।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবা তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানে হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। পরে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ের বোর্ডিংয়ে ভর্তি করা হয় তাঁকে। পরিবারের বাইরে থেকে একা থাকার অভিজ্ঞতা কাদম্বিনীকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

কলকাতায় পড়াশোনার সময় শিক্ষক হিসেবে কাদম্বিনী পেয়েছিলেন দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে। পরে তাঁর সঙ্গেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কাদম্বিনী। বিয়ের পর তাঁর নাম হয় কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।

তৎকালীন সময়ে নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই প্রতিকূলতার মধ্যেই নারীদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হন কাদম্বিনী। ১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নারীদের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়। পরের বছর শত শত ছাত্রের মধ্যে একমাত্র ছাত্রী হিসেবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন তিনি। এর মাধ্যমে প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেন কাদম্বিনী।

কাদম্বিনীর এই সাফল্যের পর বেথুন স্কুলের কলেজ শাখা চালুর পথ তৈরি হয়। সেখানে পড়াশোনা করে ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন কাদম্বিনী।

১৮৮৪ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া প্রথম নারী শিক্ষার্থী হন তিনি। ১৮৮৬ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম দিকের অনুশীলনকারী নারী চিকিৎসকদের একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।

চিকিৎসার পাশাপাশি নারীশিক্ষা ও নারী অধিকার আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। তৎকালীন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে তাঁর অগ্রযাত্রা পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য নতুন পথ তৈরি করে।

গৌরনদীর চাঁদশীতে জন্ম নেওয়া এই পথিকৃৎ নারী ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। নারীশিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।