উপ-মহাদেশের সর্ববৃহৎ বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশানে উদযাপিত হয়েছে শ্মশান দীপাবলি উৎসব। এ উৎসব ঘিরে শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যা হতেই ধুপকাঠি, হাজারো মোমবাতি আর প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে কাউনিয়া মহাশ্মশান।

দীপাবলি উৎসব ঘিরে প্রিয়োজনদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে আসেন হাজার হাজার স্বজন। কেউ স্বজনদের ছবি বুকে জড়িয়ে আছেন, কেউ বা আবার প্রিয়োজনের পছন্দের খাবার নিয়ে সমাধির পাশে বসে কাঁদছেন। প্রিয় স্বজনের আত্মার শান্তির কামনা করেন তারা।

বেওয়ারিশ এবং যাদের স্বজন নেই তাদের সমাধি শ্মশান রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়। তাছাড়া দীপাবলি উৎসবের দিন সন্ধ্যায় মোমবাতি, ধূপকাঠি ও প্রদীপ প্রজ্বলনও করা হয় কমিটির পক্ষ থেকে।

বরিশাল মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা জানান, প্রতি বছর ভূত চতুর্দশীর পুণ্যতিথিতে বরিশাল মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব আয়োজন করা হয়। এবারও দীপাবলি উৎসব ঘিরে সাজানো হয়েছে কাউনিয়া মহাশ্মশান।

তিনি জানান, কবি জীবনানন্দ দাশের পিতা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ গুপ্ত, বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, নারী নেত্রী মনোরমা বসু মাসীমা, বামপন্থি নেতা হিরণলাল ভট্টাচার্য, কংগ্রেস নেতা শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, নারী নেত্রী রানী ভট্টাচার্যসহ অনেক গুণী মানুষের স্মৃতিচিহ্ন এই মহাশ্মশানে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে মাটি এনে এখানে সংরক্ষণে সংরক্ষণ করা হয় অশ্বিনীকুমার দত্তের স্মৃতি। তার স্মারক সমাধি ও ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে মহাশ্মশানে। আদি শ্মশানে রয়েছে ব্রাহ্ম অনুসারীদের সমাধি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮০১ সালের ১ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক জন শ্যোর বাকেরগঞ্জ থেকে জেলার সদর দপ্তর বর্তমান বরিশালে স্থানান্তর করেন। প্রশাসনিক ও নগরকেন্দ্রিক জনবসতি গড়ে ওঠার ধারাবাহিকতায় নতুন বাজার এলাকায় জেলখাল সংলগ্ন স্থানে প্রথম মহাশ্মশানের যাত্রা শুরু হয়। সেখানে সমাধির সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরবর্তী সময়ে কাউনিয়া এলাকায় গড়ে ওঠে বর্তমান মহাশ্মশান। ১৮৭৬ সালে বরিশাল পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর মহাশ্মশানটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

শ্মশান রক্ষা কমিটির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ৫ একর ৯৬ শতাংশ জমিতে থাকা বরিশাল মহাশ্মশানে কাঁচা-পাকা মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার সমাধি রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৯শ সমাধি রয়েছে, যাদের স্বজনরা এ দেশে থাকেন না। এর বাইরে অজ্ঞাত ব্যক্তির সমাধি রয়েছে ৯শ। এসব সমাধি হলুদ রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বরিশাল মহাশ্মশান দীপাবলি ও কালীপূজা উদ্যাপন পরিষদের সদস্য সচিব বিজয় ভক্ত বলেন, ‘ভূত চতুর্দশীর পূণ্যতিথিতে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরেও দীপাবলি উৎসব আয়োজন করেন তারা। যেখানে বিশেষ আয়োজন ছিল মেলার।

তিনি বলেন, ‘প্রিয়জনের সমাধিতে মোমবাতি প্রজ্বলন করাই শ্মশান দীপাবলীর প্রধান উদ্দেশ্য। সেইসঙ্গে মৃত ব্যক্তিদের সমাধিতে দেওয়া হয় তার প্রিয় খাবার ও পছন্দের সামগ্রীও। সমাধি প্রাঙ্গণ সাজানো হয় ফুল দিয়ে।’

বিজয় বলেন, ১৯২৭ সাল থেকে বরিশাল মহাশ্মশানে ধারাবাহিকভাবে দীপাবলি উৎসব আড়ম্বর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি ভারত, নেপাল, শ্রীলংকাসহ উপমহাদেশ এবং বাইরের অনেক দেশ থেকে প্রচুর লোকের সমাগম ঘটে এখানে। ইতোমধ্যে এসব দেশ থেকে অনেকেই এসেছেন।

এদিকে সন্ধ্যায় শ্মশান ঘুরে দেখেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার। এ সময় তিনি বলেন, দীপাবলি উৎসব ঘিরে মানুষের সমাগম ঘটে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই নিরাপত্তার ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। শ্মশানজুড়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্মশান কমিটির পক্ষ থেকেই স্বেচ্ছাসেবকের ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উপ-মহাদেশের সর্ববৃহৎ দীপাবলি উৎসব বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশানে অনুষ্ঠিত হয়েছে।