জন্ম থেকে মৃত্যু-যাদের পুরো জীবনটাই কেটে যায় নদীর বুকে নৌকায়, তাদের শেষ বিদায়ের গল্পটা ছিল আরও বেশি নির্মম। স্বজন হারানোর তীব্র শোকের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিত অন্য এক প্রশ্ন- মরদেহটি দাফন করা হবে কোথায়? কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা নিজের এক টুকরো মাটি না থাকায়, বরিশালের মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য মৃত্যুর পর একটি কবর জোটানোও ছিল এক অলীক স্বপ্ন। অনেক সময় দাফনের জায়গা না পেয়ে প্রিয়জনের নিথর দেহ নদীতে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হতেন তারা।
নদীনির্ভর এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের সেই অবর্ণনীয় কষ্ট ও মানবিক সংকটের অবসান ঘটতে যাচ্ছে এবার। বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে এবং টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় মান্তা সম্প্রদায়ের জন্য তৈরি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট কবরস্থান।
বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাট, চরবাড়িয়া ও এর আশপাশের নদ-নদীতে যুগের পর যুগ ধরে বাস করছে মান্তা সম্প্রদায়। মাছ ধরাই তাদের প্রধান জীবিকা, আর নৌকাই তাদের একমাত্র আশ্রয়। ভূমিহীন ও ছিন্নমূল এই মানুষগুলোর জীবনের সংকট তো ছিলই, কিন্তু মৃত্যুর পর মরদেহ নিয়ে যে দুর্ভোগ পোহাতে হতো, তা সভ্য সমাজকে নাড়া দেওয়ার মতো।
স্থায়ী বসতভিটা বা সামাজিক কবরস্থানে জায়গা না পাওয়ায় স্বজনদের শেষ বিদায় জানানোর জন্য নদীপাড়ের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো তাদের। কোথাও ঠাঁই না পেয়ে অবশেষে নদীর বুকেই ভাসিয়ে দিতে হতো প্রিয় মানুষকে।
মান্তা সম্প্রদায়ের এই দীর্ঘদিনের কান্না এবার মুছে যাচ্ছে। সদর উপজেলার সিংহেরকাঠী আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন প্রায় এক একর খাসজমিতে এই কবরস্থান স্থাপনের কাজ পুরোদমে চলছে।
বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদা সুলতানা জানান, কবরস্থানটির কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, এই কবরস্থানটি শুধু মান্তা সম্প্রদায়ের জন্যই নয়, বরং সমাজের যেকোনো ছিন্নমূল ও ভূমিহীন মানুষের দাফনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই কবরস্থানটি চালু হলে অবসান ঘটবে মান্তাদের এক নীরব ও দীর্ঘস্থায়ী কান্নার। জীবনের শেষবেলায় এসে অন্তত এক টুকরো মাটির নিশ্চয়তা পাবে এই প্রান্তিক মানুষগুলো। মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষেরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে মৃত্যুর পর আর তাদের স্বজনদের মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে না, ধর্মীয় নিয়ম মেনে সম্মানের সাথে শেষ বিদায় দেওয়া সম্ভব হবে।

