বরিশালের হিজলায় মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে অভিযান চলছে, অথচ মেঘনার দুর্গম চর ও মোহনায় থামছে না ইলিশ শিকার। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নদীতে মাছ ধরছেন জেলেরা। নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন ঘাটে বসছে ইলিশের অস্থায়ী হাট। সেখান থেকে নিলামে মাছ কিনে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারেরা।

স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, হিজলা উপজেলার আটটি ঘাটে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মা ইলিশ শিকার, বেচাকেনা ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। এ সময়ে ইলিশ শিকার, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা শুরুর পরও হিজলার জানপুর, খালিশপুর, চরকিল্লা ও আবুপুরসহ মেঘনাসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ইলিশের অস্থায়ী বাজার বসছে। এসব এলাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ কেনাবেচা হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বাউশিয়া লঞ্চঘাট, পুরোনো হিজলা নদীর পাড়, দুর্গাপুর, হরিনাথপুর ও আবুপুর এলাকায় বিভিন্ন সময়ে অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ বিক্রি করা হচ্ছে। জেলেদের একাংশ বড় ট্রলার নিয়ে মূল নদীতে মাছ ধরছেন। অন্যদিকে মেঘনার শাখা নদী ও আশপাশের এলাকায় ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায়ও চলছে মাছ ধরা।

অভিযানকারী দলের ওপর হামলার অভিযোগ

মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে হিজলায় দুই দফায় হামলার মুখে পড়েছেন অভিযানকারী দলের সদস্যরা। গত ৯ অক্টোবর হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়নের ওরাকল বাজারের ৭ নম্বর ঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে অভিযান চালানোর সময় কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এরপর গত বৃহস্পতিবার অভিযানকারী আরেকটি দলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় ইটের আঘাতে দলের সঙ্গে থাকা এক শ্রমিক মাথায় গুরুতর আঘাত পান বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু সংঘবদ্ধ জেলে অভিযানকারী দলকে বাধা দিতে ইট-পাটকেল, বাঁশ, লাঠি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করেন। কোনো কোনো ট্রলারে একাধিক ইঞ্জিন থাকায় দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে অভিযান এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। জেলেদের ভাষায়, এসব দ্রুতগতির ট্রলার ‘ফাইটার’ নামে পরিচিত।

স্থানীয় ছয় জেলের দাবি, আশুলি আবুপুর, আবুপুর ও হরিনাথপুর এলাকার শাখা নদীতেও কয়েক শ ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইলিশ ধরা হচ্ছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, একটি ছোট নৌকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার এবং বড় ট্রলারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ইলিশ ধরা পড়ে। তবে এসব হিসাবের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।

আট ঘাটে কোটি টাকার বেচাকেনা

স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লা এলাকায় ইলিশ কেনাবেচার একাধিক ঘাট রয়েছে। জানপুরেই অন্তত ২০টি মাছঘাট থাকার দাবি করেছেন তাঁরা।

ঘাট-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক প্রতিনিধির দাবি, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লার ঘাটগুলোতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হয়। এর বাইরে আবুপুরের অস্থায়ী বাজারে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২৫০ জন পাইকার এসব বাজারে অবস্থান করেন বলেও তিনি জানান।

ওই প্রতিনিধির ভাষ্য, ঘাটে মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। তবে প্রতিদিনের বেচাকেনা ও কমিশনের এই হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর নদের হবিনগর থেকে মেহেন্দীগঞ্জের বামনীরচর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদীর হাট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মৌলভীর হাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার নদীপথ ইলিশ অভয়াশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। ২০১৯ সালে এলাকাটি দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।

দুর্গম চর, নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা এবং কয়েকটি জেলার সংযোগস্থল হওয়ায় এখানে অভিযান পরিচালনায় সমন্বয়গত জটিলতা তৈরি হয় বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের মতে, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরা ও পরিবহনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

ঘাট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ

স্থানীয় জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপির কয়েকজন নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে হিজলার কয়েকটি মাছঘাটের নিয়ন্ত্রণ ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের হাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ঘাটের নিয়ন্ত্রণ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল গাফফার তালুকদারের হাতে যায় বলে তাঁদের দাবি।

গত বছর আবদুল গাফফার তালুকদারের মৃত্যুর পর ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন ওরফে খোকন দপ্তরি, সদস্যসচিব দেওয়ান মনির হোসেন এবং গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের হাতে যায় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লার কয়েকটি ঘাটে দেওয়ান মনিরের দুটি, আলতাফ হোসেনের তিনটি এবং গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের দুটি ঘাট রয়েছে। এ ছাড়া আবুপুরের একটি ঘাট বরিশাল জেলা যুবদলের এক নেতা এবং হরিনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির এক শীর্ষ নেতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলতাফ হোসেন ও দেওয়ান মনির হোসেন। আলতাফ হোসেনের দাবি, তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ইলিশ শিকারের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই তাঁর ঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দেওয়ান মনির হোসেনও তাঁর ঘাট নিষেধাজ্ঞার আগেই বন্ধ করা হয়েছে বলে দাবি করেন। পাশাপাশি তাঁরা প্রশাসনকে সহযোগিতা করছেন বলে জানান। ফলে ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ ইলিশ বাণিজ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

জনবল ও বরাদ্দসংকটে অভিযান পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ

হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বিস্তীর্ণ নদী এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র দেড় লাখ টাকা। এই অর্থ দিয়ে তিন থেকে চার দিনের বেশি অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে সূত্রটির দাবি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বরাদ্দসংকটের কথা স্বীকার করে জানান, তাঁরা প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করছেন। তবে বিপুলসংখ্যক জেলে ও বড় ট্রলারের তুলনায় প্রয়োজনীয় জনবল তাঁদের নেই।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বলেন, একটি বড় চক্র অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করছে। কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান চলছে। কিন্তু জনবল কম এবং এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় নানা সমস্যা হচ্ছে। জেলেদের বেপরোয়া আচরণের কারণে রাতে অভিযান চালানোও কঠিন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, নৌবাহিনীকে অভিযানে যুক্ত করা না গেলে এই চক্রের তৎপরতা বন্ধ করা কঠিন হবে।

মা ইলিশ সংরক্ষণের জন্য প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যদি ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা চলতে থাকে, তাহলে এর প্রভাব পড়তে পারে মাছের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জেলেদের জীবিকা ও ন্যায্যতার প্রশ্নও সামনে আসে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত জনবল ও নৌযান নিশ্চিত করে মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে মাছ শিকার, পরিবহন ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে মেঘনার ইলিশ অভয়াশ্রমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হয়।