বরিশালের বাবুগঞ্জে বাবার বর্গা চাষ করা জমি একসময় নিজেই কিনে নিয়েছিলেন সুমন আহমেদ। সেই জমিতেই গড়ে তুলেছেন সমন্বিত কৃষি খামার। পেঁপে, শাকসবজি, মাছ চাষ ও পেঁপের চারা উৎপাদন করে এখন তিনি সফল কৃষি উদ্যোক্তা। চলতি বছর তাঁর খামারের আয় এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের সুমন আহমেদের শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্যে। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ হাওলাদার অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার সঙ্গে সেই জমির মসুর ডাল জমির মালিকের বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন সুমন। ডালের পরিমাণ কম দেওয়ার অভিযোগে বাবাকে অপমানিত হতে দেখে সেদিনই নিজের জমিতে চাষ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা।

জীবিকার তাগিদে প্রথমে ঢাকায় শ্রমিক ও রংমিস্ত্রির কাজ করেন সুমন। ১৯৮২ সালে হুন্দাই কোম্পানির মাধ্যমে কুয়েতে যান। এরপর কাজের সূত্রে কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। ২০০৬ সালে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। বিদেশে কাজ করার সময় বিভিন্ন দেশের আধুনিক কৃষি খামার দেখে কৃষির প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ে। সেখান থেকেই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং উন্নত জাতের পেঁপে উৎপাদনের ধারণা পান।

বিদেশে উপার্জিত অর্থ সঞ্চয় করে বাড়ির পাশে ১২৩ শতাংশ এবং অন্য জায়গায় আরও ৫০ শতাংশ জমি কেনেন তিনি। যে ধরনের জমিতে একসময় তাঁর বাবা বর্গাচাষ করতেন, সেই জমিই নিজের করে নেওয়া ছিল তাঁর জীবনের বড় অর্জন। ২০১৯ সালে দেশে ফিরে কেনা জমিতে কৃষি খামার গড়ে তোলার কাজে মনোযোগ দেন। ধীরে ধীরে পেঁপে চাষ, শাকসবজি উৎপাদন ও মাছ চাষের সমন্বয়ে গড়ে তোলেন সমন্বিত কৃষি খামার।

বর্তমানে তাঁর খামারের দুটি জমিতে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি পেঁপেগাছ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে তিনটি মাছের পুকুর। পেঁপের পাশাপাশি বেগুন, চিচিঙ্গা ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও উৎপাদন করেন তিনি। চলতি বছর পেঁপে বিক্রি করে প্রায় ১৭ লাখ টাকা আয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুমন। এ খাত থেকে অন্তত ৮ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। এ ছাড়া খামারে আরও প্রায় ৬ লাখ টাকার পেঁপে রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের আপ্যায়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

শুধু পেঁপে চাষ নয়, উন্নত জাতের পেঁপের চারা উৎপাদনেও সাফল্য পেয়েছেন সুমন। চলতি বছর ২০ লাখ চারা উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে বিভিন্ন ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সাড়ে চার লাখ চারা প্রস্তুত করেছেন। প্রতিটি চারা ৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তাঁর হিসাবে, প্রতি চারায় প্রায় দুই টাকা লাভ থাকে। উন্নত মানের চারা উৎপাদনের জন্য তিনি আধুনিক নার্সারিও গড়ে তুলেছেন। সেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধী বিশেষ পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

সুমনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তাঁর খামার থেকে আয় হয়েছিল ৬ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৫ লাখ এবং ২০২৫ সালে ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। উৎপাদন ও চারা বিক্রি বাড়াতে পারলে চলতি বছর খামার থেকে আয় এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুর রউফ তাঁর এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি তথ্য সেবা কার্যালয়ের কৃষিবিদ নাহিদ বিন রফিকের মতে, উন্নত মানের ও উচ্চফলনশীল চারার চাহিদা দেশজুড়েই রয়েছে। স্থানীয় পরিবেশের পাশাপাশি লবণাক্ত মাটিতেও উপযোগী চারা উৎপাদন করতে পারলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন।

সুমনের খামারে বর্তমানে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে ছয়জন নারী। তাঁদের একজন জেসমিন আক্তার জানান, খামারে কাজ করে তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন সুমন।

কৃষিতে আগ্রহী মানুষদের দক্ষ করে তুলতে স্ত্রী দেলোয়ারা বেগমের নামে বায়লাখালী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘দেলোয়ারা কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’। সেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ, থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সুমনের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষ তাঁর কেন্দ্র থেকে বিনা মূল্যে কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই প্রশিক্ষণ শেষে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।

কুমিল্লার লাকসাম থেকে আসা তরুণ উদ্যোক্তা ইসমাইল হোসেনও সুমনের কাছ থেকে পেঁপের চারা কিনেছেন। তিনি ২০০টি চারা সংগ্রহের পাশাপাশি এক দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

একসময় বাবার অপমানের স্মৃতি থেকে নিজের জমিতে চাষ করার যে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল, তা আজ সুমন আহমেদের জীবনের পথ বদলে দিয়েছে। বিদেশে শ্রম দিয়ে অর্জিত অর্থের বিনিয়োগ, কৃষির প্রতি আগ্রহ এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের খামার। এখন নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যদেরও কৃষিতে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাতে চান এই উদ্যোক্তা।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো