বরিশাল নগরের ত্রিশ গোডাউন এলাকায় কীর্তনখোলার তীরে দাঁড়িয়ে আছে ৩৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক খাদ্যভাণ্ডার। সড়কপথের পাশাপাশি নদীপথেও এখানে চাল পরিবহন ও দুর্যোগ পরিস্থিতির জন্য মজুতের পরিকল্পনা থেকেই সাইলোটি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু জেটির সামনে নদীর নাব্যতা কম থাকায় এখনো নৌপথে চাল পরিবহন শুরু করা যায়নি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাইলো পরিচালনার জন্য ৩১টি পদের অনুমোদন মিলেছে। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বরাদ্দের প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।

১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাক্কালে দক্ষিণাঞ্চলের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনাময় এই অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম দ্রুত চালু সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

নদীপথ সচল হওয়ার অপেক্ষা

কীর্তনখোলা নদীর তীরে প্রায় সাত একর জমিতে নির্মিত সাইলোটিতে চাল সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ১৬টি বিন। ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট এটি উদ্বোধন করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলে খাদ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহ সহজ করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

কিন্তু জেটির সামনে নদীর নাব্যতা কম থাকায় নৌপথে চাল পরিবহন শুরু করা যায়নি। ফলে সড়ক ও নৌপথ—দুই মাধ্যমে খাদ্য পরিবহনের পরিকল্পনার একটি অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

এই বাধা কাটাতে সাইলো জেটির সম্মুখভাগে প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) খনন শুরু হয়েছে। এটি শেষ হলে নদীপথে খাদ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সাইলো কর্তৃপক্ষ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম বলেন, ১৭০ মিটার দীর্ঘ জেটির সামনে খনন শেষ হলে কীর্তনখোলা নদীর মূল চ্যানেলে খননকাজ শুরু হবে।

দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নদীপথ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাসে সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নৌপথ বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে কাজে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে বরিশালের এই সাইলো থেকে দ্রুত খাদ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।

জনবল ও পরিচালন ব্যয়ে ঘাটতি

সাইলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। গত সেপ্টেম্বরে ৩১টি পদের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি ক্যাডার ও ২৬টি নন-ক্যাডার পদ। এতদিন বিভিন্ন সাইলো থেকে প্রেষণে আনা ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম চলছিল।

নিরাপত্তার জন্যও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সাইলোর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক রাকেশ বিশ্বাস জানান, ১৫ জন আনসার চাওয়া হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১২ জন নিয়োগের অনুমোদন মিলেছে।

তিনি জানান, জনবল সংকটের কারণে দিনের দায়িত্ব পালনের পর কর্মীদের রাতেও পাহারা দিতে হয়। এলাকায় একাধিকবার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার হলে সাইলো পরিচালনার কাজ আরও সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাইলোটির পরিচালন ব্যয়ের সংকটও রয়েছে। সাইলো চালুর পর প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যুৎ বিল মেটাতে মোংলা সাইলোর বরাদ্দের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চাল ওঠানো-নামানোর শ্রমিকদের বিলসহ দৈনন্দিন খরচের কিছু বিলও বকেয়া রয়েছে।

এখন অর্থনৈতিক কোড চালুর মাধ্যমে বরাদ্দ পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অর্থের সংস্থান হলে বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানো সহজ হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

৪৮ হাজার টনের সাইলোয় চাল মাত্র ৩ হাজার টন

বরিশালের সােইলোর ধারণক্ষমতা ৪৮ হাজার টন। তবে বর্তমানে ৩ হাজার ৫৭ টন চাল মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বরিশালের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা নকীব সাদ সাইফুল ইসলাম। অর্থাৎ মোট ধারণক্ষমতার তুলনায় মজুতের পরিমাণ এখনো খুবই কম।

সাইলোর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক রাকেশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, চলতি মাসে দুটি বিনে ৬ হাজার টন চাল সংরক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

এদিকে সাইফুল ইসলাম জানান, বিভাগের বিভিন্ন খাদ্যগুদামে বর্তমানে ১ লাখ ৯ হাজার টন চাল মজুত রয়েছে। এটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৪ শতাংশ। কিন্তু সাইলোর জন্য আলাদা সংরক্ষণ লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ হয়নি। ফলে সেখানে নিয়মিত চাল মজুত করা হচ্ছে না।

অর্থাৎ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা চাল সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিলেই সাইলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হবে না। কতটা চাল নিয়মিত মজুত থাকবে, কখন মজুত বাড়ানো হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে তা বিতরণ করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

খাদ্য মজুতের সঙ্গে জরুরি সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ

খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে দুর্যোগে খাদ্য সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং দুর্গত মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। বরিশালের সাইলো সেই সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। নদীর তীরে অবস্থান এবং সড়ক ও নৌপথে খাদ্য পরিবহনের পরিকল্পনা এটিকে দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে খাদ্য পরিবহন ও বিতরণের কার্যকর পরিকল্পনা থাকতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজন ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম শাহজাদা বলেন, বিশ্ব খাদ্য দিবসে বরিশালের এই খাদ্যভাণ্ডার দক্ষিণাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনা। নদীপথ সচল হলে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দুর্যোগে খাদ্য সরবরাহের বিকল্প পথ খুলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তথ্যসূত্র: বাংলা স্ট্রিম