বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফশিল এখনও ঘোষণা হয়নি। ভোটের তারিখও চূড়ান্ত নয়। এর মধ্যেই মেয়র পদে বিএনপির অন্তত ডজনখানেক নেতা মাঠে সক্রিয়। বিপরীতে জামায়াত ইতোমধ্যে একজনকে প্রার্থী চূড়ান্ত করে গণসংযোগে এগিয়ে গেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপিও প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ তফশিলের আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বরিশাল সিটির নির্বাচনি সমীকরণ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
এবারের নির্বাচন আগের দুই নির্বাচনের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন। ২০১৮ ও ২০২৩ সালের বিতর্কিত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এবং আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাত মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত অংশ নেয়নি। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপি এবং জামায়াতের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন। তবে ইসলামী আন্দোলন, বাসদ এবং এনসিপির প্রার্থীরাও ভোটের ব্যবধান নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে পর্যবেক্ষক মহল মতামত দিয়েছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বরিশালে বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি থাকলেও এবার দলটির সামনে প্রথম পরীক্ষা মনোনয়ন নিয়ে। মেয়র পদে আগ্রহী অন্তত ১০ নেতার মধ্যে রয়েছেন বিসিসির প্রশাসক ও বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমতউল্লাহ, এবায়েদুল হক চান, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহিন, মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন, অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান নান্টু, অ্যাডভোকেট আলী হায়দার বাবুল এবং মীর জাহিদুল কবির।
সিটি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় বিলকিস জাহান শিরিনের মাঠপর্যায়ের পরিচিতি ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও গণসংযোগ চালাচ্ছেন। কয়েকজন বরিশালের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকায় দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং যে যার আঙ্গিকে চালিয়ে যাচ্ছেন লবিং-তদ্বির।
দল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরে নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি অংশকে শিরিন ঘরানার এবং অন্যদের সাবেক মেয়র ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত দল কাকে মনোনয়ন দেয় এবং মনোনয়নবঞ্চিতদের কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখা যায়, বিএনপির নির্বাচনি ফলাফলে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে জামায়াতের চিত্র একেবারে ভিন্ন। দলটি কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলালকে মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় থেকেই বরিশাল সদর এলাকায় তার গণসংযোগ চলছে। মসজিদ, জানাজা, সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তিনি। দলীয় কর্মী-সমর্থকরাও সাংগঠনিকভাবে মাঠে সক্রিয়।
সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতের একক প্রার্থী থাকলেও সরাসরি নির্বাচনি সুবিধা হিসেবে দেখারও সুযোগ সীমিত। নগরীর ভোটারদের মধ্যে দলের সাংগঠনিক শক্তি কতটা ভোটে রূপ নেয় এবং বৃহত্তর ভোটারদের কাছে হেলালের গ্রহণযোগ্যতা কতটা তৈরি হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মেয়র প্রার্থী করেছে আইনজীবী ও সমাজসেবক শেখ আব্দুল্লাহ নাসিরকে। দলের নায়েবে আমির মুফতি মুহাম্মাদ ফয়জুল করিম নিজে এবার মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে ইসলামী আন্দোলনের ভোট এবার কীভাবে ভাগ হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।
বাসদের ডা. মনীষা চক্রবর্তী এবং এনসিপির এম আনোয়ার সিকদারও মাঠে রয়েছেন। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে প্রায় ২৩ হাজার ভোট পাওয়া মনীষার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে তিনি মানবিক কাজের বদৌলতে শহরবাসীর কাছে বেশ আলোচিত মুখও বটে। আর দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর প্রচারণা শুরু করেছেন আনোয়ার।
ফলে বরিশাল সিটি নির্বাচনের সম্ভাব্য চিত্র এখন তিনটি প্রশ্নে এসে ঠেকেছে, বিএনপি ডজনখানেক মনোনয়নপ্রত্যাশীর প্রতিযোগিতা থেকে কতটা ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দিতে পারে, জামায়াত তার একক প্রার্থীর সাংগঠনিক প্রস্তুতিকে কতটা ভোটে রূপ দিতে পারবে এবং ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য প্রার্থীরা মোট ভোটের সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন? তফশিল ঘোষণার পর নির্বাচনি লড়াইয়ের চিত্র স্পষ্ট হবে।
তবে শীর্ষস্থানীয় বিএনপি নেতাদের দাবি হচ্ছে, মনোনয়নের দৌড়ে একাধিক প্রার্থী বা তাদের মধ্যেকার কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও তা তফশিল ঘোষণার পরে আর থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর সবার আস্থা বা বিশ্বাস আছে। তিনি যাকে বরিশাল সিটিতে ধানের শীষের অনুমোদন দেবেন তার পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন। অবশ্য বিএনপির যে ডজনখানেক নেতা মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন, তাদের মন্তব্যও অনুরূপ।’

