ব্যবসায়ীদের মারধরের বিচার এবং চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন বরিশালের বৃহত্তর বহুমুখী সিটি পাইকারী কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পুলিশ এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক শেষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় ব্যবসায়ীর ওপর হামলাকারী ১০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মামুন বেপারী ওরফে ‘রইয়া মামুন’, তার দুই ছেলেসহ মামলার সকল আসামিদের গ্রেপ্তার, বাজারে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা এবং চাঁদাবাজি বন্ধের আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত থেকেই কাঁচাবাজারে নিয়মিত ব্যবসায়ীক কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন তারা।
এর আগে, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার চাঁদাবাজি এবং আড়তদারের ওপর হামলার প্রতিবাদে সোমবার দিবাগত রাত থেকে ধর্মঘট শুরু করেন নগরীর ভাটারখাল এলাকার বহুমুখী সিটি পাইকারী কাঁচাবাজারের ৭৪ জন আড়তদার। এ কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে বরিশালের একমাত্র পাইকারী কাঁচাবাজার থেকে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় সবজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মঙ্গলবার দিনভর তাই বরিশালের বাজারগুলোতে দেখা দেয় সবজির তীব্র সংকট।
বহুমুখি সিটি পাইকারী কাঁচা বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন, ভুক্তভোগী শাহ আলমসহ অন্য আড়তদাররা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় আড়তদার এবং কর্মচারীদের ওপর হামলা করতো পার্শ্ববর্তী ভাটারখাল বস্তির কতিপয় লোক। যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মামুন ব্যাপারী ও তার দুই ছেলে মুন্না বেপারী ও রাহুল বেপারী।
তারা অভিযোগ করেন, আড়ত থেকে কাঁচামাল কিনে আড়তের পাশেই রাস্তা দখল করে ব্যবস্থা করেন কিছু ফড়িয়া। স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মামুন ও তার দুই ছেলে তাদেরকে আড়তের সামনে বসিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারি ট্রাক আটকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা নেন তারা। প্রতিবাদ করলে আড়তদারদের মারধর করা হয়। তাদের অত্যাচারে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
রোববার সকালে কাঁচাবাজারের ফড়িয়াদের রাস্তা ছেড়ে দিতে বলায় মামুন ও তার ছেলেরা বহিরাগত নিয়ে বাজারের সবচেয়ে পুরানো ব্যবসায়ী শাহ আলম বাণিজ্যালয়ের মালিক শাহ আলম মিয়াকে মারধর করে। ওইদিন অভিযুক্ত মামুন ও তার ছেলের বিচার দাবিতে দুপুরে কাঁচাবাজারে আড়তদাররা বিক্ষোভ শেষে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে লাগাতার ধর্মঘটের আলটিমেটাম দেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাত থেকে বাজারে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম বন্ধ করে দেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যস্তমত এই পাইকারী বাজারের স্টলগুলোর সাটার নামানো। কোন কোন দোকান খোলা থাকলেও সেখানে নেই কর্মব্যস্ততা। দিনভর পুরো বাজারে চলে শুনশান নীরবতা। ব্যবসায়ীরা বাজারে ব্যানার টাঙিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারসহ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে অবস্থান নেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, হামলার ঘটনায় সোমবার থানায় সাত জনের নামে মামলা করেছেন তারা। মামলায় ১০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মামুন বেপারী, তার ছেলে মুন্না ও রাহুল, সহযোগী সাব্বির আকন, সাদ্দাম আকন, বাবুল আকন, লেমু নবীন এবং ১০-১৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। একই দিন দুপুরে আসামিদের গ্রেপ্তারসহ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার দাবিতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ বরাবর একটি স্মারকলিপিও দেয়া হয়। কিন্তু পুলিশ ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করতে না পারা বা রাজনৈতিক মহল থেকে মামুনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ধর্মঘট শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত মামুন বেপারী বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে ভাটারখাল এবং কেডিসি কলোনীতে প্রকাশ্যে জুয়ার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠে। জুয়া ব্যবসার কারণে তাকে এলাকার সবাই রুইয়া মামুন নামে চেনেন।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ঘটনায় মামুনকে প্রধান করে তার দুই ছেলেসহ ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ৫ নম্বর আসামি বাবুল আকনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ব্যবসায়ীর ওপর হামলার ঘটনায় তার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তারা বৈঠক করেছেন। ব্যবসায়ীরা তাদের নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি বন্ধসহ আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। বাজারে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় এরই মধ্যে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

