দেশে এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানি খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ার মাধ্যমে এর চাপ শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের বাজার এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। পেট্রল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা হয়েছে। রোববার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ডিজেলের দাম, প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কেরোসিনের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, পেট্রল ১৪ দশমিক ৩ এবং অকটেনের দাম প্রায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
দেশের পরিবহন ও কৃষি খাতে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হতে পারে। বাস-ট্রাক থেকে শুরু করে পণ্যবাহী যান, কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচযন্ত্র এবং বিভিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থায় ডিজেলের খরচ বেড়ে গেলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন, উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ মোকাবিলায় সরকারের কৌশল কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চাল, সবজি, মাছ, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ট্রাকে পরিবহন করা হয়। ফলে ট্রাক ও পিকআপের জ্বালানি খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেন। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে ক্রেতার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গণপরিবহনেও তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। তবে সোমবার দুপুর পর্যন্ত দেশব্যাপী বাসভাড়া বাড়ানোর কোনো নতুন সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি। রাজধানীতে অনেক বাস আগের ভাড়াতেই চলাচল করছে। অন্যদিকে কয়েকটি রুটে পরিবহন মালিকদের মধ্যে ভাড়া বাড়ানো নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের খবর এসেছে। ফলে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের আগে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলে তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, কৃষিতেও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করেন এমন কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। ক্ষেত থেকে বাজার পর্যন্ত কৃষিপণ্য পরিবহনেও বাড়তি অর্থ গুনতে হতে পারে। মাছ ধরার ট্রলার ও নৌযানেও জ্বালানি খরচ বাড়বে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব একাধিক ধাপ পেরিয়ে খাদ্যপণ্যের বাজারে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে।
শিল্প খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন, কাঁচামাল পরিবহন ও প্রস্তুত পণ্য বন্দরে নেওয়ার খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। Reuters-এর প্রতিবেদনে শিল্প ও রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানির নতুন মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে এমন সময়ে শিল্প খাতে চাপ তৈরি করবে, যখন অনেক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছে।
সরকার অবশ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং পরিবহন বা ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যাওয়ার কারণেই দেশে নতুন করে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে মার্চের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারি হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির পুরোটা ভোক্তা পর্যায়ে সমন্বয় না করায় এই লোকসান হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ মূলত মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব নিয়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমে বাড়ে সরাসরি জ্বালানি ব্যয়। এরপর পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমে সেই চাপ ছড়িয়ে পড়ে বাজারের বিভিন্ন পণ্য ও সেবায়। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন নজর থাকবে জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর সরকার গণপরিবহনের ভাড়া নতুন করে সমন্বয় করে কি না এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দামে এর কতটা প্রভাব পড়ে তার ওপর।

