ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে এক ত্রাণকেন্দ্রে রাশিয়ার হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪০-এ দাঁড়িয়েছে। গতকাল বুধবার নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি জানান, নিহতদের কয়েকজনের মরদেহ এখনো শনাক্ত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ৩০ জনের বেশি মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গত সোমবারের এই হামলাকে প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমন এক সময়ে হামলাটি চালানো হলো, যখন আগামী সপ্তাহে মস্কোর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিয়েভ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে স্থানীয় কর্মকর্তারা হামলায় ৩৭ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, হামলার পর প্রায় ৩৮ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন। সম্মুখযুদ্ধের সীমান্তবর্তী কোমিশুভাখা গ্রামের একটি স্কুল ভবনে রাশিয়া কয়েকটি বোমা নিক্ষেপ করলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভবনটি ত্রাণ বিতরণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

ইউক্রেনের দাবি, প্রাথমিক হামলার পর দ্বিতীয় দফায় চালানো হামলায় একটি ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ওই আশ্রয়কেন্দ্রে তখন বহু মানুষ অবস্থান করছিলেন। নিহতদের মধ্যে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং উদ্ধারকাজে নিয়োজিত একটি দলের দুই সদস্যও রয়েছেন।

এই হামলাকে ‘জঘন্য সন্ত্রাসী হামলা’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, রাশিয়ার এই হামলা প্রমাণ করে যে মস্কো সংঘাত প্রশমনে আগ্রহী নয়। তাঁর ভাষ্য, গত সপ্তাহে সম্মুখযুদ্ধের সীমান্তবর্তী ওলেশকি গ্রামে যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, এই হামলা সেই সুযোগও নষ্ট করেছে।

এদিকে নিহত চার পুলিশ কর্মকর্তার একজনের পরিধান করা বডি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও প্রকাশ করেছে ইউক্রেনের পুলিশ। ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষজনকে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা রেডিওতে নির্দেশিত আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা হামলার সতর্কবার্তা পান। এরপর ভিডিওতে আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে থাকা মানুষদের দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরই ভিডিওটি কালো হয়ে যায় এবং সব শব্দ থেমে যায়।

এদিকে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহে নতুন দফার আলোচনার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসবে। বৈঠকে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা চুক্তি, উত্তেজনা প্রশমন, মানবিক পদক্ষেপ এবং যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

গত ২১ অক্টোবর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর আলোচনায় বসতে সম্মত হন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে এর আগে এ ধরনের বৈঠকগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। কারণ, মস্কো তার কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি হয়নি।

রাশিয়ার দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইউক্রেনকে তার ভূখণ্ডের কিছু অংশ ছেড়ে দিতে হবে, সামরিক সক্ষমতা কমাতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের চেষ্টা না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনকে রাশিয়ার অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা গেছে। এতে কিয়েভ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে নিজের দেশের দুর্ভোগ ও যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন জেলেনস্কি। জাপোরিঝঝিয়ায় সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাতেও তিনি একই কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই উন্মত্ত হামলার ঘটনায় বিশ্ব থেকে খুব সামান্যই প্রতিক্রিয়া এসেছে। অথচ ইউক্রেন ও ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সংঘটিত হাজার হাজার যুদ্ধাপরাধের মতো এই হামলারও কঠোর জবাব দেওয়া প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘অশুভ শক্তিকে জবাবদিহির আওতায় না আনা হলে তা সব সময় আরও বেশি দূর এগিয়ে যায়।’

সূত্র: আজকের পত্রিকা