১৮২৯ সালে মাত্র ৮ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু। দুই শতাব্দীর ইতিহাসে তৈরি করেছে অসংখ্য কৃতী মানুষ। পুরোনো ভবন, ঐতিহ্যবাহী মাঠ, শৃঙ্খলা ও গৌরবময় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল বরিশাল জিলা স্কুল।
দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা ও ঐতিহ্যের কথা উঠলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় বরিশাল জিলা স্কুলের নাম। প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি বিদ্যালয় নয়, বরং বরিশালের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১৮২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর তৎকালীন বরিশালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এন. ডব্লিউ. গ্যারেটের উদ্যোগে মাত্র আটজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে বরিশাল ইংলিশ স্কুল। পরে ১৮৫৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বরিশাল জিলা স্কুল। দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে দক্ষিণ বাংলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই পাঠ্যশিক্ষার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ—দেশের নানা ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সঙ্গে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে আসে।
কৃতী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ তালিকা
বরিশাল জিলা স্কুলের সবচেয়ে বড় গৌরব এর সমৃদ্ধ প্রাক্তন শিক্ষার্থী সমাজ। বিভিন্ন সময়ে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনীতি, প্রশাসন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থা, সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন।
শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, আবদুল জব্বার খান, আলতাফ মাহমুদ, সর্দার ফজলুল করিম, বুদ্ধদেব গুহ, গোলাম মুস্তাফাসহ বহু কৃতী ব্যক্তির নাম এ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে আজও ফিরে আসে সকালের অ্যাসেম্বলি, পিটি, টিফিনের সময় মাঠে খেলাধুলা, শিক্ষকদের কঠোর শাসন এবং বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত।
পুরোনো ভবন আর বিশাল মাঠে ইতিহাসের ছোঁয়া
বরিশাল জিলা স্কুলের পুরোনো ভবনগুলো এখনো বহন করছে অতীতের স্থাপত্য ও স্মৃতির ছাপ। উঁচু ছাদ, প্রশস্ত বারান্দা, পুরোনো শ্রেণিকক্ষ ও দীর্ঘ করিডোর যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পদচারণার সাক্ষী।
বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠও শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়—এটি শৈশব ও কৈশোরের অসংখ্য স্মৃতির অংশ। ফুটবল-ক্রিকেটের পাশাপাশি বন্ধুদের আড্ডা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নানা আয়োজনেও মুখর থাকে মাঠটি।
শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধে গুরুত্ব
বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সুনামের পেছনে রয়েছে কঠোর শৃঙ্খলা, মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক। নিয়মিত অ্যাসেম্বলি, জাতীয় সংগীত, পিটি, সময়ানুবর্তিতা ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
বর্তমান প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল ইসলামও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি ঐতিহ্য, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দুই শতাব্দী পেরিয়েও আস্থার জায়গা
বর্তমানে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও ৪৫ জন শিক্ষক নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। সময়ের সঙ্গে কম্পিউটার ল্যাব, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম যুক্ত হলেও প্রতিষ্ঠানটি তার ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলার জায়গাটি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
বহু পরিবারের সঙ্গে এই বিদ্যালয়ের সম্পর্ক কয়েক প্রজন্মের। দাদা, বাবা কিংবা চাচার পর একই বিদ্যালয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করানো অনেক পরিবারের কাছে এখনো গর্বের বিষয়।
১৮২৯ সালে আট শিক্ষার্থী নিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, প্রায় দুই শতাব্দী পরও সেই পথচলা থামেনি। বরিশাল জিলা স্কুল আজও দক্ষিণ বাংলার শিক্ষা-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক—যেখানে পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে নতুন স্বপ্ন।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ

