বরিশাল জেলা জজ কোর্টের সামনের সড়কটি আজও ব্যস্ত। আদালতে আসা মানুষের ভিড়, রিকশার টুংটাং, মোটরসাইকেলের গর্জন আর যানবাহনের অবিরাম চলাচলে দিন কাটে স্বাভাবিক ছন্দে। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই, এই সড়কই একসময় ছিল প্রতিরোধের প্রতীক। এখানেই উচ্চারিত হয়েছিল পরিবর্তনের দাবিতে শত শত কণ্ঠের স্লোগান। এখানেই পুলিশের লাঠিচার্জ, ধাওয়া, গ্রেপ্তার এবং প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছিল বরিশালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
দুই বছর পেরিয়ে সেই উত্তাল সময় এখন ইতিহাস। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—যারা সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন, তারা আজ কোথায়?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও বরিশালের রাজপথে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। একসময় যেসব তরুণ-তরুণী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, মিছিলের সামনে থেকেছেন এবং প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের অধিকাংশই এখন জনসম্মুখে খুব একটা সক্রিয় নন। রাজপথে নেই, কর্মসূচিতেও নেই। অনেকেই যেন স্বেচ্ছায় সরে গেছেন আলোচনার কেন্দ্র থেকে।
বরিশালের আন্দোলনের স্মৃতি বলতে গেলে কয়েকটি নাম বারবার সামনে আসে—লামিয়া সাইমুন, জান্নাত নিপু, ফারজানা, সুজয় শুভ, নাঈম, সুজন, হুজাইফা এবং নাম-না-জানা আরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী।
আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতেই তারা ছিলেন সামনের সারিতে। কখনো মিছিলের অগ্রভাগে, কখনো স্লোগানের নেতৃত্বে, কখনো আহত সহযোদ্ধাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে। ভয়, হুমকি কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তাদের থামাতে পারেনি। তারা শুধু আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী ছিলেন না, বরং হয়ে উঠেছিলেন বরিশালের প্রতিবাদের দৃশ্যমান প্রতীক।
বরিশালের আন্দোলনের ইতিহাসে ৩১ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন জেলা জজ কোর্ট সড়কে চলমান কর্মসূচি চলাকালে লামিয়া সাইমুন, জান্নাত নিপু, ফারজানাসহ কয়েকজন নারী আন্দোলনকারী স্লোগান দিচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
অভিযোগ রয়েছে, লামিয়া সাইমুনসহ কয়েকজন নারী আন্দোলনকারীকে ওড়না ধরে টেনে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয় এবং পরে আটক করা হয়। একই ঘটনায় সুজয় শুভ, নাঈম, হুজাইফাসহ আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে কয়েকজনকে কিছু সময় আটকে রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার ভিডিও ও স্থিরচিত্র দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে বরিশালের জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুহূর্তগুলোর একটি।
সেই সময় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন লামিয়া সাইমুন। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে স্লোগান দেওয়া এবং লাঠিচার্জের মুখেও পিছু না হটার দৃশ্য তাকে আন্দোলনের প্রতীকী মুখে পরিণত করেছিল।
দুই বছর পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফোনে কোনো সাড়া মেলেনি। একসময় যিনি প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় ছিলেন, এখন তিনি অনেকটাই নীরব।
শুধু লামিয়া নন, বরিশালের আন্দোলনের আরও অনেক পরিচিত মুখ এখন জনসম্মুখ থেকে সরে গেছেন।
আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী সুজয় শুভ বলেন, “আমরা জুলাইয়ে অংশ নিয়েছিলাম, কারণ এই ভূখণ্ডের মানুষকে দীর্ঘদিন ভাত ও ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। জুলাই ছিল সেই বঞ্চনারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেখলাম, জনগণের সংকট কাটেনি। যেখানে জনগণই অনুপস্থিত হয়ে যায়, সেখানে নিজেদের উপস্থিতিরও কোনো অর্থ থাকে না। এজন্যই গুটিয়ে গেছি।”
আন্দোলনের আরেক পরিচিত মুখ জান্নাত নিপু বলেন, “আমরা হারিয়ে যাইনি। কিন্তু একপক্ষ ক্ষমতার ব্যবহার করে জুলাইকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছে, যা আমাদের চাওয়া ছিল না। এখন শুনি, অমুক-তমুক ‘মাস্টারমাইন্ড’। অথচ গণঅভ্যুত্থানে একজন মাস্টারমাইন্ড থাকে না, সবাই-ই মাস্টারমাইন্ড। জুলাই ছিল আমাদের সামষ্টিক স্বার্থের আন্দোলন। সেখানে ঐক্যের প্রয়োজন ছিল। ছয়জন রিকশাশ্রমিক জুলাইয়ে মারা গেলেও তাদের কথা কেউ বলেনি। জুলাইকে ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। এসব কারণেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি।”
একসময় প্রতিদিন রাজপথে দেখা যেত যাদের, তাদের অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, চাকরির প্রস্তুতি কিংবা কর্মজীবনের ব্যস্ততায় সময় কাটাচ্ছেন। কেউ ব্যক্তিগত জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, কেউ আবার সংগঠিত রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন।
তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকের মতে, তাদের নীরবতার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা নয়; রয়েছে আন্দোলন-পরবর্তী হতাশা, মতপার্থক্য, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক এবং আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন।
আজ জেলা জজ কোর্টের সেই সড়কে আর স্লোগান শোনা যায় না। নেই পুলিশের ধাওয়া, ব্যারিকেড কিংবা উত্তেজনায় থমকে যাওয়া শহর। আছে কেবল স্বাভাবিক নগরজীবনের ব্যস্ততা। কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি মুছে যায় না।
বরিশালের জুলাই আন্দোলনের কথা উঠলেই ফিরে আসে কয়েকটি মুখ, কয়েকটি দৃশ্য এবং কিছু সাহসী মুহূর্ত। সময় হয়তো তাদের রাজপথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ইতিহাস থেকে নয়।
লামিয়া সাইমুন, জান্নাত নিপু, ফারজানা, সুজয় শুভ, নাঈম, সুজন, হুজাইফা এবং নাম-না-জানা আরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী—তারা আজ হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। তবু বরিশালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে তাদের পদচিহ্ন অমলিন।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা সংকটময় সময়ে নিজের নিরাপত্তার চেয়ে নিজের বিশ্বাসকে বড় করে দেখেছিলেন। রাজপথ থেকে তারা সরে যেতে পারেন, কিন্তু সাহস, প্রতিবাদ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে তাদের ভূমিকা ইতিহাসে থেকে যায়।
তথ্যসূত্রঃ নিউজজি

